বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

বাস্তবায়ন-অযোগ্য শর্তে আটকে লেবানন, দক্ষিণে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির আশঙ্কা

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন নিরাপত্তা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর বদলে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, চুক্তিতে এমন একটি শর্ত রাখা হয়েছে, যা বাস্তবে পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু হিজবুল্লাহ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না। অন্যদিকে লেবাননের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বিবেচনায় জোর করে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করাও প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তাদের ভাষ্য, এই বাস্তবতায় ইসরায়েল সহজেই যুক্তি দেখাতে পারবে যে চুক্তির শর্ত পূরণ হয়নি। ফলে দক্ষিণ লেবাননে তাদের সেনা মোতায়েন দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হবে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এরপরই দুই পক্ষের মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এতে লেবাননের ওপর একাধিক দায়িত্ব চাপানো হলেও ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক কোনো নিশ্চয়তা রাখা হয়নি। ফলে দেশটি এমন এক অবস্থায় পড়েছে, যেখানে শর্ত পূরণে অক্ষম হলে সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথও অনিশ্চিত হয়ে যাবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চুক্তিটি লেবাননের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে লেবাননের এক জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক বলেন, এটি প্রকৃত অর্থে কোনো সমঝোতা নয়; বরং বাইরের চাপের ফলে তৈরি একটি রফা। তার মতে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার মতো সাংগঠনিক কিংবা সামরিক সক্ষমতা লেবাননের সেনাবাহিনীর নেই। এমন প্রত্যাশা বাস্তবতা বিবর্জিত এবং এটি দেশের নাজুক সাম্প্রদায়িক ভারসাম্যকেও উপেক্ষা করে।

বৈরুতভিত্তিক বিশ্লেষক মাইকেল ইয়াংয়ের মতে, পুরো চুক্তির বোঝা লেবাননের কাঁধে চাপানো হয়েছে। তার ভাষায়, এ ধরনের কাঠামো ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবাননে অনির্দিষ্ট সময় অবস্থান করার সুযোগ দিতে পারে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের গবেষক ফাওয়াজ গের্গেসও চুক্তিটিকে শুরু থেকেই কার্যত অকার্যকর বলে মনে করছেন। তিনি বলেন, যেহেতু পুরো ব্যবস্থাটি এমন একটি শর্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা বাস্তবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তাই এটি কাঠামোগতভাবেই দুর্বল।

গের্গেসের মতে, ইসরায়েল ইতোমধ্যে দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীর একটি বাফার জোন গড়ে তুলেছে। ভবিষ্যতে সেনা প্রত্যাহারকে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করায় এই নিরাপত্তা অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে এবং একসময় কূটনৈতিক বৈধতাও পেয়ে যেতে পারে। তার ভাষায়, এটি ইসরায়েলের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সুবিধা।

তিনি আরও বলেন, লেবাননের পরিস্থিতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক ঘিরে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ। তবে ওয়াশিংটন দুই সংকটকে আলাদা ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করায় লেবাননে ইসরায়েল তুলনামূলক বেশি স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত এই রূপরেখা চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের লেবাননের ভূখণ্ডের ওপর কোনো দাবি নেই। তবে দক্ষিণাঞ্চলে লেবাননের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে হিজবুল্লাহসহ সব অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতাকে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এটি ভবিষ্যতের বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়ার পথ খুলে দিতে পারে। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণের কথিত নিরাপত্তা অঞ্চলে অবস্থান করছে। তাদের দাবি, উত্তরাঞ্চলকে সম্ভাব্য হামলা থেকে সুরক্ষা দিতেই এই ব্যবস্থা।

হিজবুল্লাহবিরোধী ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১০ লাখ লেবানিজ।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন চুক্তিটিকে দেশের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার আশা, এর মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যেতে পারবেন।

তবে পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, এটি একতরফা নির্দেশনামূলক চুক্তি, যা লেবাননের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না এবং বাস্তবায়নও সম্ভব হবে না।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম চুক্তিকে সম্পূর্ণ বাতিল ও অকার্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি একে আত্মসমর্পণের দলিল আখ্যা দিয়ে বলেন, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে। দলটির আইনপ্রণেতা হাসান ফাদলাল্লাহও সতর্ক করে বলেছেন, এই চুক্তি লেবাননের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে উসকে দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাষ্ট্র যদি জোরপূর্বক হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে, তাহলে তা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়িয়ে নতুন গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মাইকেল ইয়াংয়ের ভাষায়, এই চুক্তির পরিণতি লেবাননকে গৃহযুদ্ধ কিংবা শিয়া সম্প্রদায়ের বিদ্রোহের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচও মনে করেন, হিজবুল্লাহর বিলুপ্তি বাস্তবসম্মত কোনো সম্ভাবনা নয়। তার মতে, এই চুক্তির ফলে কার্যত কিছুই বদলাবে না। ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে না, আবার হিজবুল্লাহও অস্ত্র ত্যাগ করবে না।

তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ সশস্ত্র অবস্থায় থাকা এবং ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি সরকারের পক্ষে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে।

সিট্রিনোভিচের মতে, হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর উত্তর তীরে সরিয়ে নেওয়া, লেবানন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদারের মতো সীমিত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলে সেই চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকত।

একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন হিজবুল্লাহপন্থি বিশ্লেষক মোহাম্মদ ওবায়েদও। তার মতে, চুক্তির ধারাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা লেবাননের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে নড়বড়ে করে দিতে পারে। কারণ, পুরো প্রক্রিয়াটিই নির্ভর করছে এমন এক রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের ওপর, যা বাস্তবে কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *