জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচির সূচনা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কর্মসূচির প্রথম দিনে রাজধানীর রায়েরবাজারে শহীদদের গণকবরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্নের বাংলাদেশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
বুধবার (১ জুলাই) দুপুরের আগে রায়েরবাজার কবরস্থানে শহীদদের গণকবর জিয়ারত করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। বৃষ্টির মধ্যেই তারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
বক্তব্যে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, লিয়াকতসহ প্রায় ১ হাজার ৪০০ শহীদ এবং ৩০ হাজার আহত আন্দোলনকারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী, শ্রমিক, নারী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী, অভিভাবক, আলেম, আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আন্দোলনে সহায়তাকারী সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তরুণ সামরিক সদস্যদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু তার দাবি, সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।
ইনুর রায়ে অসন্তোষ
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর দেওয়া ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের রায় নিয়েও প্রতিক্রিয়া জানান এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, এই রায়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশিত বিচার নিশ্চিত হয়নি। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সহযোগী জোটের অংশ হিসেবে ইনু তৎকালীন সরকারের গণহত্যার সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করেছিলেন। তাই রাষ্ট্রপক্ষের উচিত এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে আরও কঠোর শাস্তির আবেদন করা।
বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতির অভিযোগ
বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি মামলার রায় হয়েছে। তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিলেও ধীরগতি রয়েছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণ।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, শেখ হাসিনাসহ জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত এবং ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে ভারতে অবস্থানরত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর এবং শহীদ পরিবারের আর্থিক সহায়তা ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরও দাবি জানান।
সংস্কার ও গণভোটের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দাবি
নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সারা দেশে জুলাইয়ের শহীদদের কবর সংরক্ষণের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি কবরস্থানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এ ছাড়া জুলাই সনদ এবং গণভোটে দেওয়া সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দাবিও জানান তিনি। তার ভাষায়, রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি এখনো পূরণ হয়নি। তাই এবারের বর্ষপালনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে গণহত্যার বিচার এবং সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিকে সামনে আনা।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান উদ্যাপন করলেই হবে না; সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে রয়েছে।
৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই জাদুঘর চালুর দাবি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর এখনো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে জাদুঘর খুলে দেওয়া উচিত। অন্যথায় জনগণ নিজেরাই সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাইকে কেন্দ্র করে ৩৬ দিনব্যাপী সরকারি কর্মসূচি থাকলেও বর্তমান বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে এখনো তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে সরকার শিগগিরই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কর্মসূচিতে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ ও আবদুল্লাহ আল আমিন, রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আলী আহসান জুনায়েদ ও আকরাম হুসাইন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক রিফাত রশিদসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এনসিপি ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ শিরোনামে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ সময় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পদযাত্রা, গণসংযোগ, শহীদ স্মরণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে। কর্মসূচির সমাপ্তি হবে ৫ আগস্ট ‘বিজয়ের উল্লাস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।








