রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

ইসরায়েলকে রক্ষায় পর্যাপ্ত নৌ-শক্তি নেই যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে ওয়াশিংটনকে ভবিষ্যতে কঠিন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে পেন্টাগনকে সতর্ক করেছেন মার্কিন বাহিনীর ইউরোপিয়ান কমান্ডের (ইউকম) প্রধান জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ।

শনিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সম্প্রতি পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক জরুরি বার্তায় গ্রিনকেভিচ উল্লেখ করেন, দ্রুত আরও একটি মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করা না হলে একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজস্ব বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়া, এই দুই অগ্রাধিকারের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর পাঁচটি ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন রয়েছে। এগুলো ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চলতি বছরের শেষ দিকে আরও একটি ডেস্ট্রয়ার যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, গত পাঁচ মাস ধরে টানা অভিযান চালাতে হওয়ায় বিদ্যমান জাহাজগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে কমে আসছে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এবং বাড়ছে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনকেভিচের সতর্কবার্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, তিনি কোনো স্বাধীন বিশ্লেষক নন; বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী অন্যতম শীর্ষ কমান্ডার। তার এই মূল্যায়ন মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরে সম্পদ ও সক্ষমতা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ডেস্ট্রয়ারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব যুদ্ধজাহাজ দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ‘এসএম-৩’ ও ‘এসএম-৬’ শ্রেণির উন্নত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম। তবে একই ধরনের ডেস্ট্রয়ার যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক কৌশলেও অপরিহার্য। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলা, ইউরোপে ন্যাটো মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও সমুদ্রপথ সুরক্ষায় এগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ইসরায়েলের জন্য অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করলে অন্য অঞ্চলে মার্কিন সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করেছে। পেন্টাগনের হিসাব বলছে, চলমান সংঘাতে মার্কিন বাহিনী ২০০টির বেশি ‘থাড’ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা দেশটির মোট মজুতের প্রায় অর্ধেক।

এর পাশাপাশি নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারগুলো থেকেও শতাধিক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। যদিও ইসরায়েল নিজস্ব ‘অ্যারো’ ও ‘ডেভিডস স্লিং’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে, তবুও বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় তাদের ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের’ (সিএসআইএস) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ ব্যয় করেছে। পেন্টাগনের মজুত পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের প্রায় ৪৫ শতাংশ, থাড ও প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের অন্তত ৫০ শতাংশ এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। একই সঙ্গে নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ‘এসএম-৩’ ও ‘এসএম-৬’ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ২০ শতাংশও শেষ হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র যে গতিতে ব্যবহার হচ্ছে, সেই তুলনায় নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও মজুত পুনর্গঠন অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর অধিকারী হলেও, একই সময়ে একাধিক সংঘাত সামাল দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্রমবর্ধমান সম্পদসংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *