বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

বিদায়ী বক্তব্যে বারবার কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে একদিকে আবেগঘন বিদায় নিলেন দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অন্যদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলীয় সংসদ সদস্যদের সতর্ক করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে মির্জা ফখরুল বক্তব্য দেওয়ার সময় একাধিকবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। দলের দীর্ঘ পথচলায় পাশে থাকা নেতা-কর্মীদের কথা স্মরণ করে তিনি দোয়া চান এবং আগামীকাল বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রায় দেড় ঘণ্টার এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান। সভার শুরুতে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন এবং মির্জা ফখরুলের পক্ষে ভোট চান। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং মির্জা ফখরুল নিজেও ভোট দেবেন। নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে তার ঠাকুরগাঁও-৩ আসনটি শূন্য হবে।

এরপর বক্তব্য দিতে দাঁড়ান মির্জা ফখরুল। বক্তব্যের শুরুতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। পাশাপাশি দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের স্মৃতিও তুলে ধরেন ফখরুল। দীর্ঘ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনকালে তার কোনো ভুল হয়ে থাকলে কিংবা অজান্তে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে ক্ষমা চান তিনি।

মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি তাকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও তিনি তা রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করবেন না বলেও অঙ্গীকার করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে বঙ্গভবনে গেলে দলের সহকর্মীদের মিস করবেন, এ কথা বলতে গিয়েও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ফখরুল। সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মিনিটের বক্তব্যে চার থেকে পাঁচবার কেঁদেছেন তিনি। তার বক্তব্যে বৈঠকের পরিবেশও আবেগঘন হয়ে ওঠে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আবেগাপ্লুত হন।

ফখরুলের পর বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক একটি দিন। অনেক মূল্য দিয়ে আমরা আজ এ জায়গায় এসেছি।’ এ অবস্থানে পৌঁছাতে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন তিনি।

রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের সর্বত্র জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জবাবদিহি অপরিহার্য, এ বিষয়টি সবাইকে মনে রাখতে হবে।

মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করে তারেক রহমান বলেন, দলের কঠিন সময়ে তিনি সাহসের সঙ্গে বিএনপির হাল ধরেছেন এবং কখনো হাল ছাড়েননি। রাজনৈতিক জীবনে তাকে কারাবন্দীও হতে হয়েছে। সেই সময়ে তারেক রহমানকে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে দলের সংসদ সদস্যদের মির্জা ফখরুলের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও শৃঙ্খলা ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।

তবে বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সামনে থাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তারেক রহমান জানান, অনেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে নিজ নিজ এলাকায় দলের নেতা-কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের দূরত্ব যেন আরও না বাড়ে, সে বিষয়ে সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলেন তিনি।

এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কারণে নির্বাচনটি তুলনামূলকভাবে বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। গত সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কেউ কেউ প্রার্থী হওয়ায় দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার যেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য আগে থেকেই সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রার্থী করার ওপরও জোর দেন তারেক রহমান। তার মতে, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়ে তাকে জয়ী করতে দলের সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ফলে বিএনপির সংসদীয় দলের বুধবারের বৈঠকটি শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল না। মির্জা ফখরুলের আবেগঘন বিদায়ের পাশাপাশি দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে দলের কৌশলও বৈঠকে স্পষ্ট হয়েছে।

সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *