কাতারের মাটিতে ইসরায়েলি সামরিক হামলার বিষয়টি এবার প্রকাশ্যেই স্বীকার করলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি শুধু হামলার কথা স্বীকারই করেননি, বরং কাতারকে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪ নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি কাতারে হামলা করেছি, বোমা হামলাও চালিয়েছি। (গাজা) যুদ্ধের সময় তাদের ওপর হামলা করেছি। আর তারাও আমার ওপর হামলা করেছে।’ শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাক্ষাৎকারটির ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।
নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন কাতারে ইসরায়েলি হামলার এক বছর পূর্তির সময় ঘনিয়ে আসছে। ফলে তার প্রকাশ্য এই স্বীকারোক্তি নতুন করে ওই হামলা এবং এর রাজনৈতিক-আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
মধ্যস্থতাকারী কাতারই কেন ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্য?
গাজা যুদ্ধ বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতার চেষ্টা করে আসছে কাতার। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং বন্দিবিনিময় নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিভিন্ন সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারের এমন ভূমিকা রয়েছে।
তবে নেতানিয়াহুর দাবি, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সময় কাতার ইসরায়েলের নীতিনির্ধারণে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। বরং সাক্ষাৎকারে তিনি দেশটিকে সরাসরি ‘শত্রুভাবাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এই বক্তব্য কাতারের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের বৈপরীত্যটিও সামনে আনে, একদিকে দোহা যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী, অন্যদিকে সেই দেশেই ইসরায়েলি সামরিক অভিযান।
দোহায় হামলার ঘটনায় নিহত হন হামাস নেতারা
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার লক্ষ্য ছিল হামাসের শীর্ষস্থানীয় পাঁচ নেতা। গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য ওই নেতারা বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠক চলার সময়ই তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
হামলায় হামাসের ওই পাঁচ নেতা নিহত হওয়ার পাশাপাশি কাতারের একজন নিরাপত্তাকর্মীও প্রাণ হারান।
ঘটনাটি কাতারের জন্য ছিল সরাসরি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়। দোহা হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেয়। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি হামলাটিকে ‘কাপুরুষোচিত’ বলে মন্তব্য করেন।
হামলার পর কাতারের পাশে আরব দেশগুলো
দোহায় হামলার পর কাতারের প্রতি সংহতি জানায় কয়েকটি দেশ। ইরান ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ হামলার নিন্দা করে। একই সঙ্গে হামলার পরপরই জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নেতারা কাতার সফর করেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ওই হামলাকে কাতারের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেন।
অর্থাৎ হামলাটি শুধু ইসরায়েল ও হামাসের সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পড়ে কাতারের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতেও।
কাতারে হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়
কাতারের সঙ্গে হামাসের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ২০১২ সাল থেকে কাতার সরকার দেশটিতে হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয় পরিচালনার সুযোগ দিয়ে আসছে। কাতারের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই তারা হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়কে দেশে থাকার সুযোগ দিয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে দোহায় হামলা ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যে দেশটি হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আশ্রয় দিয়েছে এবং একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে, সেই দেশটির ভূখণ্ডেই ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে।
এক বছর পর নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য বক্তব্য
দোহায় ওই হামলার প্রথম বার্ষিকী আসন্ন। তার কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহু সাক্ষাৎকারের ভিডিও প্রকাশ করলেন এবং নিজের মুখেই কাতারে হামলা চালানোর কথা বললেন।
ফলে তার বক্তব্য শুধু পুরোনো একটি সামরিক অভিযানের দায় স্বীকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি কাতারের সঙ্গে ইসরায়েলের টানাপোড়েন, গাজা যুদ্ধের কূটনীতি এবং মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রের ভূমিকাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্নও সামনে আনছে।








