ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগের জেরে এক নারীকে আটকে রেখে চুল কেটে দেওয়া ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুরের সদরপুরে। নির্যাতনের শিকার ২৮ বছর বয়সী ওই নারী সৌদি আরবপ্রবাসী এক ব্যক্তির স্ত্রী। ঘটনার দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। ভিডিওতে একপর্যায়ে ওই নারীকে চেয়ারে বসিয়ে চুল কাটতে এবং পরে তাকে চড় মারতে দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে ওই নারী ও এক যুবককে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করতে দেখা গেছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বেপারীডাঙ্গী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. জলিল মোল্লা। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছে পুলিশ।
অভিযোগের বিচার করতে গিয়ে নির্যাতন
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারীর সঙ্গে এক যুবকের সম্পর্ক থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। শনিবার (১০ অক্টোবর) বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে ফেরেন ওই নারী। ওই দিন দিবাগত রাতে তার কক্ষ থেকে পরিবারের সদস্যরা তাকে এক যুবকের সঙ্গে আটক করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পরে ওই যুবক পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করেন। এরপর ওই নারী ও যুবককে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। পরদিন রোববার বিকেলে ওই নারীর চুল কেটে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আটক যুবককে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে ওই নারীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে আটকে রেখে মারধর করা কিংবা জোরপূর্বক চুল কেটে দেওয়ার বৈধতা তৈরি হয় না। ঘটনার পেছনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং নির্যাতনের দায় নিরূপণ পৃথক বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে যা দেখা যায়
১ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারীকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক তার হাত ধরে রেখেছেন। চেক টি-শার্ট পরা আরেক যুবক কাঁচি দিয়ে তার মাথার চুল এলোমেলোভাবে কাটছেন।
ভিডিওতে নারীটিকে চিৎকার করতে শোনা যায়। তারপরও চুল কাটার কাজ চলতে থাকে। ভিডিওর শেষাংশে দুই যুবককে ওই নারীর মুখে থাপ্পড় মারতে দেখা যায়।
অন্য একটি ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে রাতে ওই নারী ও তার কথিত প্রেমিককে একটি গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। ওই সময় তাদের মারধর করা হচ্ছিল বলে ভিডিওতে দৃশ্যমান।
ভিডিও দুটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলোর পূর্ণ প্রেক্ষাপট, ধারণের সুনির্দিষ্ট সময় এবং নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত সবার ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্ত দুই যুবক সম্পর্কে যা জানা গেছে
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই নারীকে চুল কেটে নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত দুই যুবকের নাম সুমন হোসেন ও জয় হোসেন। তাদের বয়স ২৮ থেকে ৩২ বছরের মধ্যে। তারা ওই সৌদি আরবপ্রবাসীর ভাগনে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তবে তাদের বক্তব্য, ঘটনার সময় তাদের নির্দিষ্ট ভূমিকা এবং এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো মামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের নজরে ঘটনা, শনাক্তে একাধিক দল
সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন শাহ বলেন, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে।
তিনি বলেন, কেউ অপরাধ করলে তার জন্য আইন রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনোই কাম্য নয়। এ ধরনের কাজ আইনবিরোধী।
পুলিশের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার বিচার করার ক্ষমতা ব্যক্তিগতভাবে কারও নেই। অভিযোগের তদন্ত, অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণ এবং অপরাধ প্রমাণের প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়ার কথা।
অভিযোগের বাইরে বড় প্রশ্ন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আইনের শাসন
সদরপুরের এ ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটকে রেখে প্রকাশ্যে অপমান ও শারীরিক নির্যাতনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো?
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ওই নারীকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার পর তার চুল কেটে দেওয়া হয় এবং পরে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠানো হয়। এসব ঘটনার পূর্ণ বিবরণ ও দায় কার কতটুকু, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার নারীর নিরাপত্তা, তার বক্তব্য গ্রহণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে তদন্তের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।
পরকীয়ার অভিযোগ সত্য কি না, সেটি এক প্রশ্ন; আর অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে কি না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ওপর।
পুলিশের পক্ষ থেকে শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরুর কথা জানানো হলেও তদন্তের অগ্রগতি, সম্ভাব্য মামলা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনটি স্থানীয় সূত্র, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিবরণ এবং সদরপুর থানা পুলিশের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।








