বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

চাকরির খোঁজে রাশিয়া গিয়ে জড়াচ্ছে যুদ্ধে, প্রবাসীদের কেউ নিখোঁজ, কেউ ফিরছেন কফিনে

প্রতিশ্রুতি ছিল নির্মাণশ্রমিকের কাজের, কিন্তু রাশিয়ায় গিয়ে জড়াতে হয়েছে যুদ্ধে। ড্রোন হামলায় কেউ হারিয়েছেন হাত-পা, অনেকে নিখোঁজ, আবার কারও মৃত্যুর খবর এসেছে পরিবারের কাছে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই বাংলাদেশির এখন একটাই চাওয়া, যেকোনোভাবে দেশে ফেরা।

রাশিয়ায় নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মো. আলী হাসান সোহেলকে। এখন তিনি দেশটির পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরের ওই হাসপাতালে এক মাস ১০ দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। তবে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তাকে তাড়া করছে আরেকটি ভয়, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলে আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হতে পারে তাকে।

গত বুধবার ভিডিও কলে কথা বলার সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে আলী হাসান বলেন, ‘এ জীবন কেউ চায় না। এটা কোনো জীবন না। বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেছি, সুস্থ হলে [দেশে ফেরানোর] চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু সুস্থ হলে তো আবার যুদ্ধে পাঠিয়ে দেবে।’

যুদ্ধে যাওয়ার আগে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার কথা ছিল তার। এখন কবে দেশে ফিরতে পারবেন, তা নিয়েই উদ্বেগে দিন কাটছে। আলী হাসানের ভাষ্য, এক বছরের মধ্যে তিনি আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন কি না, সেটিও অনিশ্চিত।

তিনি বলেন, ‘কবে দেশে ফিরতে পারব, এই প্রার্থনা করি সারাক্ষণ। যেমনে পারেন, আমারে উদ্ধার করেন; পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন।’

পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ, এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে
গত ৭ মে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে একসঙ্গে ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। আলী হাসান তাদের একজন। তার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি ওই দলের আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাশিয়ায় পৌঁছে তারা প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। বরং প্রতারণার মাধ্যমে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনেরা।

নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ৩০ জনকে একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। আলী হাসান ছিলেন ১৬ জনের একটি দলে।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ষষ্ঠ দিনে পাঁচজনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। দীর্ঘ পথ হেঁটে এবং সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার খেয়ে তারা তিন দিন পর একটি সুড়ঙ্গে পৌঁছান। সেটি ছিল মাটির নিচে তৈরি সেনা ক্যাম্প। পরে তাদের দলের অন্য ১১ জনও সেখানে যোগ দেন।

এরপর একপর্যায়ে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয় এবং সেনাবাহিনীর পোশাক পরিয়ে একজন একজন করে সামনের দিকে পাঠানো হয়। আলী হাসানের দাবি, তার ১৬ জনের দলের ১৪ জন এখন নিখোঁজ। বাকি দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানালে বন্দী করে রাখা, মারধর ও শাস্তি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন আলী হাসান। তার ভাষায়, অস্ত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলা হতো, যুদ্ধ করতে হবে না; শুধু সামনে-পেছনে কিংবা ডানে-বাঁয়ে যেতে হবে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে গেলেই ইউক্রেনের ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়তে হতো তাদের। কেউ মারা গেছেন, কেউ আহত হয়েছেন।

ড্রোন হামলায় হাত হারিয়েছেন পলাশ
একই দলের আরেক সদস্য মো. পলাশ শেখও দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। প্রথম দফায় আলী হাসানের সঙ্গে পাঁচজনের যে দলটি যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিল, পলাশ ছিলেন তাদের একজন। ড্রোন হামলায় তার একটি হাত উড়ে গেছে। বর্তমানে মস্কোর একটি হাসপাতালে ২৪ দিন ধরে চিকিৎসাধীন তিনি।

পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম তার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি হাত হারানোর পর পলাশকে আর যুদ্ধে পাঠানো হবে না বলে তারা আশা করছেন। তবে সুস্থ হওয়ার পর রুশ কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো জানা যায়নি।

আবু সালেহর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও সুস্থ হওয়ার পর দেশে ফেরানোর চেষ্টা করার কথা জানানো হয়েছে। পলাশ যেকোনো উপায়ে দেশে ফিরতে চান।

গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার বাসিন্দা পলাশ উন্নত জীবনের আশায় ধারদেনা ও উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়ে তার বোন চুমকি খানম গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, রাশিয়ায় গিয়ে পলাশ প্রতারণার শিকার হন এবং কৌশলে ও জোরপূর্বক তাকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ঋণের চাপ কমাতে আর্থিক সহায়তার অনুরোধও জানানো হয়েছে।

৩০ জনের দলে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর খবর
আলী হাসানসহ রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ জনের মধ্যে ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাদের পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। দুজন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। অন্য দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাকি দুজনও দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হয় ২০২৩ সালে। এরপর গত তিন বছরে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। তাঁদের কেউ কেউ কাজের প্রলোভনে গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা জানা কঠিন। তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

দেশে ফেরানো ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুন স্বামীকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছেন। গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া ওই আবেদনে বলা হয়, জীবিকার তাগিদে রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হন আলী হাসান এবং শেষ পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনীর হাতে পড়েন। এদিকে পরিবারের সদস্যদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে, পাওনাদারদের চাপও রয়েছে।

তবে আলী হাসান ও পলাশের বিষয়ে মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং দেশে ফিরতে চান, এমন কেউ দেশে ফেরানোর জন্য দূতাবাসের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করেননি।

রাশিয়ায় কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ সম্পর্কে ঢাকায় রুশ দূতাবাসের বক্তব্য জানতে গত বুধবার ই-মেইল পাঠানো হয়েছিল। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে প্রথম আলো।

অন্যদিকে, রাশিয়ায় নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে না আসা এবং তাঁদের পরিবার ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, আহত বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশ দূতাবাসকে। একই সঙ্গে তাদের চিকিৎসার ব্যয়, পাওনা অর্থ এবং ক্ষতিপূরণ রাশিয়ার কাছ থেকে আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

তাসনিম সিদ্দিকীর মতে, রাশিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালে ভর্তি দুই বাংলাদেশির দায়িত্ব নিতে হবে দূতাবাসকে। তারা সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে দেশে ফিরতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আলী হাসান ও পলাশের কাছে এখন দেশে ফেরা শুধু পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং অনিশ্চিত এক যুদ্ধজীবন থেকে মুক্তির অপেক্ষা। তাদের পরিবারও চাইছে, প্রবাসে কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে তারা দেশ ছেড়েছিলেন, অন্তত জীবিত অবস্থায় যেন সেই মানুষগুলো ঘরে ফিরতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *