বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

সৌদিতে ৬ মাসে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, তালিকায় বাংলাদেশিরাও

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৯ জনই বিদেশি নাগরিক, যাদের তালিকায় বাংলাদেশিসহ ১৭টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের সবচেয়ে বড় অংশ ছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধের মামলা। একই সময়ে হত্যা, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত এবং অন্যান্য অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আইনি সহায়তা এবং শিশু অবস্থায় সংঘটিত কথিত অপরাধের জন্য সাজাপ্রাপ্তদের নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

মৃত্যুদণ্ডের অর্ধেকের বেশি বিদেশিদের
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ৫৯ জন বিদেশি এবং ৪৯ জন সৌদি নাগরিক। অর্থাৎ মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৫৪ শতাংশ কার্যকর হয়েছে বিদেশিদের বিরুদ্ধে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তানের নাগরিক রয়েছেন।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মোট সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে। তাদের হিসাবে, সৌদি আরবের আগের শাসনামলগুলোর তুলনায় এ সংখ্যা সর্বোচ্চ।

মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ড ৭১ জনের
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রধান কারণ ছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধ। মোট ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৭১টি এ ধরনের মামলায় কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ২৫ জনের। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় এ সংখ্যা ৯। অন্য অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে আরও তিনজনের।

মাদকসংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৯ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। অর্থাৎ মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশই ছিল বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মাদক অপরাধের মামলা।

ইএসওএইচআরের পরিসংখ্যানে এ অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশিদের মধ্যে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

ইচ্ছাকৃত হত্যা নয়, এমন অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড
ইএসওএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি এমন অপরাধে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ইচ্ছাকৃত হত্যার সম্পর্ক ছিল না। সংস্থাটির হিসাবে, এ সংখ্যা মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগকে ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যে ব্যাখ্যা রয়েছে, তার সঙ্গে এসব সাজার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

সাজার ধরন বিশ্লেষণ করে ইএসওএইচআর জানিয়েছে, ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৪টি কার্যকর করা হয়েছে ‘তাজির’ বিধানের আওতায়। এ ক্ষেত্রে বিচারকের বিবেচনামূলক ক্ষমতার ভিত্তিতে সাজা নির্ধারণ করা হয়। মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৯১টির বিষয়ে সাজা কার্যকরের আগে ইএসওএইচআর বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগাম তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। মোট সংখ্যার ৮৪ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলাও আলোচনায়
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তালিকায় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলাও রয়েছে। ইএসওএইচআরের হিসাবে, বছরের প্রথম ছয় মাসে এ ধরনের মামলায় নয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

প্রতিবেদনে গত জুনে সৌদি আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের বেআইনি আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তার আটকাদেশকে বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী বলে বিবেচনা করেছিল।

এ ছাড়া ৯ এপ্রিল আলী আল-সুবাইতি নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইএসওএইচআরের দাবি, শৈশবে সংঘটিত কথিত অপরাধের জন্য এখনো অন্তত পাঁচজন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের কয়েকজনের আটকাদেশকে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ বেআইনি ঘোষণা করে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিল।

শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মধ্যে শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকির নাম রয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আসছেন। তবে তাদের বিচারপ্রক্রিয়া এখনো অমীমাংসিত।

বিদেশি বন্দীদের আইনি সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বিদেশি বন্দীদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে ইএসওএইচআর।

সংস্থাটির নথি অনুযায়ী, খামিস মুশাইত কারাগারে ৫৮ জন ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে পাঁচজন ইথিওপীয় ও পাঁচজন সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে আটজন মিসরীয় নাগরিক মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বন্দীদের মামলায় পেশাদার দোভাষীর অভাব, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা না পাওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে অসুবিধা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ না থাকার অভিযোগ তুলেছে সংস্থাটি।

ইএসওএইচআরের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন বন্দী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কায় দিন কাটানোর কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা কিছু বন্দীকে অল্প সময়ের জন্য অন্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে এবং বাইরের যোগাযোগ বন্ধ করার পর তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি বলেছে, এসব অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বন্দীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে আরও তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর

এদিকে সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। ১৪ অক্টোবর দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আদালতে পাঠানো হয়। পরে শরিয়াহ আইনের ‘তাজির’ বিধানের আওতায় আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। মসজিদের পবিত্রতা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ এবং ঘটনার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ সাজা দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।

তবে ওই দুই বাংলাদেশির মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের বিস্তারিত বিবরণ কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাধীন মূল্যায়ন সম্পর্কে এখানে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন
ইএসওএইচআরের মূল্যায়ন, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের উচ্চ হার এবং বিদেশি নাগরিকদের ওপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন ও শিশু অধিকার সনদের অধীনে সৌদি আরবের দায়বদ্ধতা পালনের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক প্রয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং আইনি সহায়তা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এসব নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে পৃথক কোনো প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনের সরবরাহ করা তথ্যের মধ্যে নেই। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সৌদি সরকারের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র: ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর) ও সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *