সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

সবশেষ

সৌদি আরবে বাংলাদেশি প্রবাসীদের যেসব ভুলে হতে পারে বিপদ, মানতে হবে ১৬ বিষয়ে সতর্কতা

সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে শুধু কর্মসংস্থান বা বৈধ কাগজপত্র থাকলেই নিরাপদ থাকা নিশ্চিত হয় না। দেশটির আইন, সামাজিক রীতিনীতি, সড়ক চলাচল, আর্থিক লেনদেন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হয়। সামান্য অসতর্কতা কিংবা অপরিচিত কারও কথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে প্রবাসীদের পড়তে হতে পারে আইনি ও আর্থিক জটিলতায়। এসব ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে করণীয় ও বর্জনীয় তুলে ধরা হয়েছে একটি নির্দেশিকায়।

নির্দেশিকায় সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে চাকরি পরিবর্তন, বেতন-ভাতা, দুর্ঘটনা, নারী ও শিশুদের সঙ্গে আচরণ, ধর্মীয় অনুশাসন এবং দেশে ফেরার প্রক্রিয়া পর্যন্ত নানা বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

সৌদি যাওয়ার আগেই শুরু হোক সতর্কতা
প্রবাসজীবনে প্রতারণা ও ভোগান্তি এড়াতে দেশ ছাড়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ভিসা, নিয়োগকর্তা ও নিয়োগচুক্তি ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। বিএমইটি ছাড়পত্র, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করে বিদেশ যেতে হবে। পাসপোর্ট ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিজের কাছে সংরক্ষণ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, দালালের মৌখিক আশ্বাসে টাকা দেওয়া, কাজের উদ্দেশ্যে ভিজিট ভিসায় যাওয়া কিংবা পাসপোর্ট অন্যের জিম্মায় রাখার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

ইকামা, চাকরি ও বেতন নিয়ে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
সৌদি আরবে অবস্থানকালে ইকামার মেয়াদ নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং Absher অ্যাকাউন্ট সচল রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি QIWA প্ল্যাটফর্মে নিয়োগচুক্তি ও চাকরির প্রস্তাব যাচাই করতে বলা হয়েছে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

চাকরিসংক্রান্ত কোনো কাগজ না বুঝে স্বাক্ষর করা, OTP বা পাসওয়ার্ড অন্যকে দেওয়া এবং কোম্পানি পরিবর্তনের নামে কাউকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে।

বেতন ও চাকরির অধিকার নিশ্চিত করতে নিয়োগপত্রের কপি, কাজের প্রমাণ এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংরক্ষণ করতে হবে। বেতন ব্যাংকিং চ্যানেলে গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ হলে কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা দূতাবাসের সহায়তা নিতে বলা হয়েছে। শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগের জন্য ১৯৯১১ নম্বরের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

চাকরি পরিবর্তন ও দেশে ফেরার আগে চারটি বিষয়
চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে QIWA প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশে ফেরার আগে কোনো জরিমানা বা ট্রাভেল ব্যান রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে মোবাইল সিম ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার বিষয়টিও মাথায় রাখতে বলা হয়েছে।

নির্দেশিকায় ৮০ হাজার রিয়াল বা তার বেশি নগদ অর্থ কিংবা স্বর্ণ সঙ্গে থাকলে কাস্টমসে ঘোষণা করার কথা বলা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া নতুন কাজে যোগ দেওয়া, ফাইনাল এক্সিট ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করা এবং অন্যের ঋণ বা মোবাইল ফোন বহন করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে কী করবেন, কী করবেন না
সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির বিমা নিশ্চিত করা, ট্রাফিক সিগন্যাল ও গতিসীমা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে নাজম বা পুলিশের রিপোর্ট সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল ছেড়ে যাওয়া, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ব্যবহার এবং ট্রাফিক জরিমানা বকেয়া রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে।

কেউ দুর্ঘটনায় আহত হলে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৯৯৭ অথবা সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৯১১/৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। উদ্ধারকারীদের চলাচলের পথ খালি রাখতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান না থাকলে আহত ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনে টেনে তোলা কিংবা আহত ও নিহত ব্যক্তির ব্যক্তিগত জিনিসপত্রে হাত না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

টাকা-পয়সা ও সম্পদের নিরাপত্তায় গুরুত্ব
প্রবাসীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংক বা অনুমোদিত এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। প্রতি মাসে সঞ্চয় করা, সময়মতো বিল ও ঋণ পরিশোধ এবং লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো, নিজের ব্যাংক হিসাব বা কার্ড অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়া, অন্যের ঋণের জামিনদার হওয়া এবং অন্যের নামে ব্যবসা করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

সামাজিক আচরণ ও ধর্মীয় বিষয়ে মানতে হবে নিয়ম
সৌদি আরবে বসবাসের সময় স্থানীয় আইন ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শালীন পোশাক পরা, বয়স্কদের সম্মান করা, প্রকাশ্যে মারামারি ও গালাগালি থেকে বিরত থাকা এবং জাতি, দেশ বা গায়ের রং নিয়ে কটূক্তি না করার পরামর্শ রয়েছে।

এ ছাড়া অনুমতি ছাড়া অর্থ বা চাঁদা সংগ্রহ, অবৈধভাবে কাজ করা, গাছ কাটা কিংবা শিকার করার মতো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

ধর্মীয় অনুশাসনের ক্ষেত্রে নামাজের সময় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া, রমজানে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকা, মসজিদে মোবাইল ফোন নীরব রাখা এবং ধর্মীয় স্থানে সম্মানজনক আচরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নারী ও শিশুদের সঙ্গে আচরণে বাড়তি সতর্কতা
নারী ও শিশুদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু নির্দেশনা রয়েছে। অচেনা শিশুদের স্পর্শ করা, কোলে নেওয়া কিংবা খাবার দেওয়ার বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে। নারীদের অনুসরণ করা, অনুমতি ছাড়া স্পর্শ করা, বিরক্ত করা কিংবা অপরিচিত নারীর কাছে ফোন নম্বর চাওয়া ও মেসেজ পাঠানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিবেশীর বাড়িতে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং জনসমাগমস্থলে স্থানীয় নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ওষুধ, স্বাস্থ্য ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা
দেশ থেকে ওষুধ নেওয়ার ক্ষেত্রে সৌদি ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অথরিটির (SFDA) অনুমতি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। ওষুধের প্রেসক্রিপশন ও মূল প্যাকেট সঙ্গে রাখতে হবে। অন্যের দেওয়া ব্যাগ, প্যাকেট বা ওষুধ বহন না করার পাশাপাশি মাদক ও জুয়া থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ওষুধসংক্রান্ত অনুমতির জন্য নির্দেশিকায় SFDA-এর ওয়েবসাইটও উল্লেখ করা হয়েছে: https://cds.sfda.gov.sa

কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হেলমেট, সেফটি ভেস্ট ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, ছায়ায় বিশ্রাম এবং বিদ্যুৎ ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুপুর ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত খোলা রোদে কাজ না করার নির্দেশনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

ছবি-ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা
অনলাইনে কোনো তথ্য বা খবর শেয়ার করার আগে সত্যতা যাচাই, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং দুই ধাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুধু অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।

অনুমতি ছাড়া শিশু, নারী কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত ছবি ধারণ, গুজব ও অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া এবং নিরাপত্তা-সংবেদনশীল স্থানের ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রচার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

বিপদে পড়লে যেসব নম্বরে যোগাযোগ করবেন
সৌদি আরবে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পেতে কয়েকটি নম্বর সংরক্ষণে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকায় উল্লেখিত নম্বরগুলো হলো,

৯১১: রিয়াদ, মক্কা, মদিনা ও পূর্বাঞ্চলের জরুরি সেবা।
৯৯৯: অন্যান্য অঞ্চলের জরুরি পুলিশ সেবা।
৯৯৭: অ্যাম্বুলেন্স।
৯৯৮: সিভিল ডিফেন্স।
৯৯৩: ট্রাফিক পুলিশ।
১৯৯১১: শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগ।
০১১৮১০০৬০০: বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ।
০১২৬৬০০৬০০: বাংলাদেশ কনস্যুলেট।

এ ছাড়া কোনো আরবি কাগজের বিষয়বস্তু না বুঝে স্বাক্ষর না করা, পুলিশের সঙ্গে অযথা তর্কে না জড়ানো এবং সমস্যা সমাধানের নামে দালালকে টাকা না দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।

নির্দেশিকাটির মূল বার্তা হলো, সৌদি আরবে নিরাপদে থাকতে হলে দেশটির আইন মেনে চলা, প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ রাখা এবং কোনো জটিলতায় পড়লে নিজে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা নেওয়া জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *