বিয়েতে আত্মীয়স্বজন নেই বললেই চলে। বন্ধু ও পরিচিতজনের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। তাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটিতে অতিথিদের জন্য সাজানো চেয়ার-টেবিল ফাঁকা পড়ে থাকবে, এমন আশঙ্কা ছিল চীনের ২৪ বছর বয়সী তরুণ সু চেংহংয়ের। সেই চিন্তা থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষদের নিজের বিয়েতে আমন্ত্রণ জানান তিনি। চেয়েছিলেন, অন্তত ১০-২০ জন মানুষ এসে তার আনন্দের দিনে পাশে দাঁড়াক। কিন্তু সেই আমন্ত্রণ যে হাজারো মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে আসবে, তা কল্পনাও করেননি তিনি।
একটি ছোট্ট ভিডিও পোস্ট থেকেই শুরু হয় অভাবনীয় ঘটনা। কেউ ছুটে আসেন শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, কেউ নিয়ে আসেন গরু, শূকর, ফ্রিজ, রান্নার সরঞ্জাম ও নানা উপহার। কেউ আবার বিনা পারিশ্রমিকে রান্না, ঘর সাজানো কিংবা বিয়ের গাড়ির ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নেন। শেষ পর্যন্ত অতিথির সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে পরিবর্তন করতে হয় বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল। স্থানীয় প্রশাসনকেও পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসতে হয়।
চীনের ইউনান প্রদেশের ঝাওতং শহরের ইলিয়াং কাউন্টির লুওয়াং মিয়াও জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকার এই বিয়ের ঘটনা এখন দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
শৈশবের কষ্ট থেকে বিয়ের আয়োজন
বর সু চেংহং অনলাইনে ‘শিয়াও শিয়াও সু’ নামে পরিচিত। মাত্র তিন বছর বয়সে অসুস্থতাজনিত কারণে বাবাকে হারান তিনি। পাঁচ বছর বয়সে তার মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন দাদি। কিন্তু দুই বছর পর দাদিও অসুস্থ হয়ে মারা যান। ফলে ছোটবেলাতেই পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষদের হারান দুই ভাই।
পরে আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় বেড়ে ওঠেন তারা। আর্থিক সংকটের কারণে অষ্টম শ্রেণির আগেই পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামতে হয় সু চেংহংকে। জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। কখনো সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করেছেন, কখনো খাবার বিক্রি করেছেন, আবার কখনো পার্সেল সরবরাহ ও বাছাইয়ের কাজ করেছেন।
দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে নিজের বিয়ের জন্য অর্থ জমিয়েছিলেন তিনি। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিয়ের প্রস্তুতির জন্য তার সঞ্চয় ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ ইউয়ান।
যেভাবে পরিচয় প্রেমে, তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত
সু চেংহংয়ের সঙ্গে তার হবু স্ত্রী লুও চুইয়ের পরিচয় হয়েছিল অনলাইনে। মেয়েটির লাইভ ভিডিও দেখে প্রথমে তার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। পরে দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
২০২৩ সালের দিকে তাদের প্রথম সরাসরি দেখা হয়। তখন সু কাজ করতেন চীনের শানডং প্রদেশে, আর লুও পড়াশোনা করছিলেন লিয়াওনিং প্রদেশে। প্রথমবার দেখা হওয়ার পর লুও একটি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। খবর পেয়ে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তার কাছে ছুটে যান সু। অসুস্থ অবস্থায় পাশে থেকে যত্ন নেন। এই অভিজ্ঞতার পর তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয় এবং প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
লুওয়ের বাড়ি চীনের গুইঝৌ প্রদেশে। পরে তিনিও ঝেজিয়াং প্রদেশের জিনহুয়ায় একটি পার্সেল প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। সু চেংহংয়ের আর্থিক ও পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে শুরুতে মেয়েটির পরিবার এই সম্পর্ক নিয়ে কিছুটা আপত্তি জানিয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং সুয়ের দায়িত্বশীল আচরণ দেখে শেষ পর্যন্ত তারা সম্মতি দেন।
তিন বছরের সম্পর্কের পর ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর বিয়ের দিন নির্ধারণ করেন তারা।
কেন অপরিচিতদের বিয়েতে ডাকলেন সু?
বিয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে সু চেংহং বুঝতে পারেন, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের সংখ্যা খুবই কম। সব মিলিয়ে অতিথিদের জন্য দুই-তিনটি টেবিলও পূর্ণ করা কঠিন হতে পারে। জীবনের এত বড় আয়োজন এভাবে নিরানন্দ হয়ে যাক, তা চাননি তিনি।
এমন চিন্তা থেকেই ২৫ অক্টোবর চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ডুয়িনে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে বিয়েতে আসার আমন্ত্রণ জানান।
তার প্রত্যাশা ছিল, আশপাশের এলাকা থেকে ১০-২০ জন মানুষ এলেই তিনি খুশি হবেন। কিন্তু ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। চীনের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ বিয়েতে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অনেকে সরাসরি যাওয়ার প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেন।
২৭ অক্টোবর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে সু জানান, অপরিচিত মানুষের এমন সাড়া তিনি কল্পনাও করেননি।
কেউ আনলেন গরু, কেউ শূকর, কেউ আবার ফ্রিজ
আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মানুষের উপস্থিতির পাশাপাশি উপহারের পরিমাণও বাড়তে থাকে। কেউ নিয়ে আসেন ফ্রিজ, কেউ রান্নার জন্য ওভেন ও অন্যান্য সরঞ্জাম। কেউ আবার আস্ত শূকর নিয়ে হাজির হন। এমনকি কয়েকজন অতিথি গরু উপহার দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন।
সিচুয়ান প্রদেশের এক কৃষক দুটি গরু নিয়ে আসেন, যার আনুমানিক মূল্য ছিল ২০ হাজার ইউয়ান। অন্যদিকে, হুনান প্রদেশের হুয়াইহুয়া থেকে এক বিয়ের সাজসজ্জা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রায় ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এসে বাড়ি সাজানোর কাজে সহযোগিতা করেন।
কেউ বিয়ের গাড়ির ব্যবস্থা করেন, কেউ ফটোগ্রাফি ও সাজসজ্জার দায়িত্ব নেন। আবার কেউ বর-কনের চুল ও মেকআপ করার প্রস্তাব দেন। একজন শুভাকাঙ্ক্ষী বিয়ের গাড়ির বহরে মার্সিডিজ-মেবাখ যুক্ত করার ব্যবস্থাও করেন। অতিথিদের অনেকেই শুধু বিয়েতে অংশ নিতে আসেননি, বরং আয়োজনের বিভিন্ন দায়িত্বও নিজেদের কাঁধে তুলে নেন।
রান্নার আয়োজনে কয়েক টন খাবার, ৫০টি চুলায় ব্যস্ত রাঁধুনিরা
অতিথির সংখ্যা বাড়তে থাকায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় খাবারের ব্যবস্থা। বিয়েতে আসা মানুষ যেন কেউ অভুক্ত না ফেরেন, সে জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে রাঁধুনিরা এগিয়ে আসেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান রাঁধুনি জিয়া সিয়ংলুর নেতৃত্বে রান্নার বিশাল আয়োজন করা হয়। শুধু ২৯ অক্টোবর এক দিনেই প্রায় দুই টন মুরগির মাংস রান্না করা হয়। রান্নার জন্য প্রায় ৫০টি চুলা বা রান্নার স্টেশন চালু রাখা হয়েছিল।
বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নিজেদের এলাকার খাবার ও উপকরণ নিয়ে আসেন। সেসব উপকরণ দিয়েই তৈরি করা হয় নানা ধরনের খাবার। অতিথিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা চলতে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। এমনকি রাত দুইটার পরও যারা পৌঁছেছেন, তাদের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে।
৩১ অক্টোবর বিয়ের মূল আয়োজনের দিনও অতিথিদের জন্য বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়। স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও নাচ-গানেও মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।
অতিথির চাপে বদলাতে হলো বিয়ের স্থান
প্রথমে সু চেংহংয়ের বাড়ির পাশের একটি ছোট জায়গায় বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মানুষের উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় সেখানে অনুষ্ঠান করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
২৮ অক্টোবরের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষের আসার খবর জানান সু নিজেই। পরে আরও মানুষের আগমন ও আগ্রহ বাড়তে থাকে। ২৯ অক্টোবর রাতেই বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা অতিথিদের ভিড় দেখা যায়। অনেকের থাকার জন্য আশপাশের হোটেলও পূর্ণ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল পরিবর্তন করা হয়। সুয়ের বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে লুওয়াং গ্রামের হেংদিয়ানজি এলাকার একটি বড় সাংস্কৃতিক চত্বরে আয়োজন সরিয়ে নেওয়া হয়।
৩১ অক্টোবর নির্ধারিত দিনে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে হাজারো মানুষের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। ভিড় সামলাতে যানবাহন চলাচল ও নিরাপত্তার বিষয়েও স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রশাসনও এগিয়ে এলো অতিথিদের স্বাগত জানাতে
বিয়ের আমন্ত্রণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসে। ঝাওতং শহরের সংস্কৃতি ও পর্যটন বিভাগের কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করেন। নিরাপত্তা ও অতিথিদের সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হয়।
ঝাওতংয়ের সংস্কৃতি ও পর্যটন বিভাগের উপপ্রধান ঝাং মেই জানান, তরুণটির জীবনসংগ্রামের গল্প বহু মানুষকে স্পর্শ করেছে। দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষদের যথাসম্ভব ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এমনকি অতিথিরা যেন বিয়েতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোও ঘুরে দেখতে পারেন, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং আশপাশের ১১টি কাউন্টি ও জেলার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানান তিনি।
একটি আমন্ত্রণ, হাজারো মানুষের ভালোবাসা
সু চেংহংয়ের বিয়ের গল্পে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অপরিচিত মানুষেরা কীভাবে একজন তরুণের জীবনের বিশেষ মুহূর্তকে নিজেদের আনন্দের অংশ করে নিয়েছেন। যার আশঙ্কা ছিল বিয়ের আসরে অতিথির অভাবে চেয়ার-টেবিল ফাঁকা থাকবে, শেষ পর্যন্ত তার অনুষ্ঠানেই জায়গা সংকট দেখা দেয়।
একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও যে এত মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে, এই ঘটনা তারই ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
সু চেংহংয়ের কাছে শুরুতে চাওয়া ছিল মাত্র কয়েকজন মানুষের উপস্থিতি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পেয়েছেন হাজারো মানুষের শুভেচ্ছা, সহযোগিতা ও ভালোবাসা। জীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে নতুন সংসার শুরু করার দিনে অপরিচিত মানুষদের এই উপস্থিতিই হয়ে উঠেছে তার বিয়ের সবচেয়ে বড় উপহার।








