সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

সবশেষ

ইরান যুদ্ধ নিয়ে দোটানায় ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ দু’সপ্তাহে গড়িয়েছে। আর এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন যুদ্ধের সূচনাকারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন প্রশ্ন, তিনি কি যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন—নাকি ক্রমেই বিস্তৃত ও তীব্র হয়ে ওঠা এই সংঘাত থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার পথ খুঁজবেন।

যুদ্ধ শুরু করার সময় ট্রাম্প প্রশাসন যে ঝুঁকিগুলোকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছিল, বাস্তবে সেগুলোর প্রভাব এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধ চালিয়ে গেলে একদিকে দুর্বল হয়ে পড়া ইরানের ওপর আরও চাপ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, তবে এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সামরিক পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।

যুদ্ধের ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বাড়ছে এবং মার্কিন সেনাদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, কারণ তিনি নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন যুদ্ধের মধ্যে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, যদি যুক্তরাষ্ট্র এখনই যুদ্ধ থেকে সরে আসে, তাহলে ট্রাম্পের ঘোষিত বেশিরভাগ লক্ষ্যই অপূর্ণ থেকে যাবে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ইরানকে যেন আর কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না দেওয়া। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে এখন পর্যন্ত ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে।

এই সংঘাতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইরান।  তবে দেশটির ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এখনও টিকে আছে এবং নেতৃত্বে নতুন শক্তি উঠে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনও সাইবার হামলা, সমুদ্রপথে মাইন পাতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২,১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইরানের নাগরিক। জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১,৩০০ জন বেসামরিক মানুষ। এদিকে যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা পাঠাচ্ছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে, আর নতুন করে ২,৫০০ মেরিন সদস্য পাঠানো হচ্ছে। মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের কাছেও হামলা চালিয়েছে।

যুদ্ধের বড় প্রভাব পড়েছে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালি  দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন হয়। কিন্তু হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এখন অনেক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রিটেনকে ওই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র একা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে এবং এখন বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জোট গড়ার চেষ্টা করছে।

যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের কাছে এখনও প্রায় ৯৭০ পাউন্ডের মতো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে। এই ইউরেনিয়াম গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, যদি এসব উপাদান সরিয়ে নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইরান আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে পারে। তবে সেগুলো উদ্ধার করতে হলে বিশেষ সামরিক অভিযান চালাতে হবে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার মতে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বড় অংশ ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়েছে।

তবু বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনও বিভিন্ন উপায়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে। ফলে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *