মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি ওমানকে ঘিরে দেওয়া তার কঠোর হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এমন বক্তব্য শুধু মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ‘আক্রমণাত্মক’ ও ‘অপ্রত্যাশিত’ হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময় সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ কিংবা যুদ্ধের হুমকি দিয়ে তিনি বহু দেশকে চাপে রেখেছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে আবারও সেই পুরোনো বিতর্ক সামনে এসেছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করেই মূলত নতুন এই উত্তেজনার সূত্রপাত। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়, তার প্রায় ২০ শতাংশ এই রুট ব্যবহার করে। ফলে এই প্রণালীর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেকোনো উত্তেজনা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে এই কৌশলগত নৌপথে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর মধ্যেই ইরানি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, তেহরান ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে শুল্ক আরোপের বিষয়ে একটি খসড়া চুক্তি করেছে।
এই খবর প্রকাশের পর হোয়াইট হাউসে এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া জানতে চান। জবাবে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জলসীমার অংশ এবং এটি সব দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কোনো রাষ্ট্র সেখানে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় ওমানের উদ্দেশে ট্রাম্প সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে হবে, অন্যথায় কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। এমনকি তিনি “উড়িয়ে দেওয়া হবে” ধরনের হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেন, যা সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ওমানকে ঘিরে ট্রাম্পের এমন ভাষা অনেককেই বিস্মিত করেছে। মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তির আলোচনা শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ট্রাম্প হয়তো বক্তব্য দেওয়ার সময় ভুল করে ইরানের পরিবর্তে ওমানের নাম বলেছেন। কারণ অতীতেও বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি একাধিক দেশের নাম গুলিয়ে ফেলেছেন। এর আগে ইরান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ভেনেজুয়েলার নাম উল্লেখ করার ঘটনাও সামনে এসেছিল।
তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে হোয়াইট হাউস কিংবা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্যের ভিডিও ও বক্তব্যের লিখিত অংশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আচরণ তার বহুল আলোচিত “ম্যাডম্যান থিওরি”-রই অংশ। অর্থাৎ অপ্রত্যাশিত ও ভয় প্রদর্শনমূলক অবস্থান নিয়ে প্রতিপক্ষকে মানসিক চাপে রাখার কৌশল তিনি বরাবরই ব্যবহার করেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ট্রাম্প তার দুই মেয়াদে অন্তত ১৫টি দেশকে সরাসরি হামলা কিংবা সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। এর ফলে বিশ্বের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী যুদ্ধের সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সমালোচকরা দাবি করছেন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে যখন শান্তি আলোচনা নিয়ে নানা উদ্যোগ চলছে, ঠিক সেই সময় ওমানকে ঘিরে এমন উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।








