লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সংঘাতের মাত্রা আরও বেড়েছে। মার্কিন মধ্যস্থতায় সম্পাদিত যুদ্ধবিরতির শর্ত উপেক্ষা করে ইসরাইল সামরিক অভিযান জোরদার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লিতানি নদী অতিক্রম করে ইসরাইলি বাহিনী তাদের স্থল অভিযান আরও গভীরে বিস্তৃত করেছে। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অব্যাহত বিমান ও ড্রোন হামলায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
শুক্রবার (২৯ মে) একদিনেই অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া গত এক সপ্তাহে গড়ে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১১ জন শিশু নিহত বা আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে ওয়াশিংটনে দুই দেশের সামরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে।
নাবাতিয়েহ অঞ্চলে তীব্র সামরিক তৎপরতা
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পূর্ব লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে নাবাতিয়েহ শহরের দক্ষিণে অবস্থিত উঁচু ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এসব অভিযানে শত শত বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং কামানের গোলাবর্ষণ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বেসামরিক এলাকায় হামলায় প্রাণহানি
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, শুক্রবার টায়ার শহরের নিকটবর্তী আব্বাসিয়াহ এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে চালানো হামলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। একই দিনে দেইর কানুন আল-নাহর এলাকাতেও পৃথক হামলায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়।
এদিকে রাজধানী বৈরুতের আকাশে নিয়মিত ইসরাইলি ড্রোনের উপস্থিতি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক বোমাবর্ষণের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে।
সীমান্ত সফরে নেতানিয়াহুর নতুন ঘোষণা
শনিবার (৩০ মে) লেবানন সীমান্ত পরিদর্শনের সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, ইসরাইলি সেনারা লিতানি নদী অতিক্রম করে আরও অগ্রবর্তী অবস্থানগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
তিনি দাবি করেন, বৈরুত থেকে শুরু করে বেকা উপত্যকা পর্যন্ত পুরো ফ্রন্টজুড়ে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীকে অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
কারাউন বাঁধ নিয়ে উত্তেজনা
অন্যদিকে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, পশ্চিম বেকা অঞ্চলের কারাউন বাঁধের আশপাশে তাদের উপস্থিতির যে দাবি ইসরাইল করছে, সেটি বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়।
সংগঠনটির মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেই এমন অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে। ফলে কারাউন বাঁধকে ঘিরেও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিশুদের ওপর বাড়ছে সংঘাতের প্রভাব
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, চলমান হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু নিহত বা আহত হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিমান হামলায় বহু শিশু গুরুতর শারীরিক আঘাত পেয়েছে। গত ২ মার্চ শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পাশাপাশি লাখ লাখ নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন।
কূটনৈতিক উদ্যোগে নতুন বৈঠক
সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে ওয়াশিংটনে পেন্টাগনের উদ্যোগে লেবানন ও ইসরাইলের সামরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি নিরাপত্তা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। আলোচনায় তিনি যেকোনো নতুন পদক্ষেপের আগে দ্রুত ও কার্যকর যুদ্ধবিরতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও লেবাননের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মানবিক সংকটের শঙ্কা
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও সীমান্তে ইসরাইলের সামরিক অগ্রযাত্রা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে লিতানি নদী অতিক্রম করে অভিযান সম্প্রসারণকে অনেক বিশ্লেষক সংঘাতের নতুন পর্যায় হিসেবে দেখছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্য আরও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।








