রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

সেউতায় অভিবাসীর ঢলের পর সমুদ্রে ১,৬০০ ফুট ভাসমান বাধা নির্মাণে স্পেন

উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসী সংকটের পর সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে মাদ্রিদ। মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন উপকূলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট দীর্ঘ একটি ভাসমান প্রতিবন্ধক (ফ্লোটিং ব্যারিয়ার) স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

দুই দিন আগে সেউতায় হাজার হাজার অভিবাসীর একযোগে প্রবেশের ঘটনায় ইউরোপজুড়ে স্পেনের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর পরপরই অধিকাংশ অভিবাসীকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হলেও, এখনো শহরে অবস্থানরত কিছু অভিবাসীর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ভাসমান প্রতিবন্ধকটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৫০০ মিটার বা ১ হাজার ৬০০ ফুট। এটি স্ফীত করা যায় এমন একটি কাঠামো, যা পানির নিচে প্রায় এক মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। পাশাপাশি স্পেনের নৌবাহিনী নোঙর করা বয়ার আরেকটি সারি বসিয়ে পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করবে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৮ হাজার ৩০০ জনকে গত শুক্রবার বিকেলের মধ্যে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে। এছাড়া শত শত মানুষ রাতের মধ্যেই স্বেচ্ছায় সেউতা ছেড়ে চলে যান।

সেউতায় নিযুক্ত স্পেন সরকারের এক গণমাধ্যম কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে শহরে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এই পরিস্থিতির পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০টিরও বেশি সদস্যদেশ ইউরোপীয় কমিশনের কাছে চিঠি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছে। একই সময়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও কমিশনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সরকারের অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। পাশাপাশি স্পেনকে শেনজেন অঞ্চলের বাইরে রাখার প্রস্তাবকে তিনি ‘স্বার্থপর’ উদ্যোগ বলে মন্তব্য করেন।

সেউতায় অবস্থান করা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের কয়েক শ অভিবাসী জানিয়েছেন, তারা মরক্কোর নাগরিক নন। তাই স্পেন তাদের মরক্কোয় ফেরত পাঠাতে পারবে না বলেই তারা মনে করেন। তাদের অনেকেই অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবারের পর থেকে তারা কোনো খাবার পাননি।

অন্যদিকে সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের বড় একটি অংশ ছিলেন কর্মসংস্থানের আশায় আসা তরুণ মরক্কোর নাগরিক। তাদের পাশাপাশি সুদানসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে পালিয়ে আসা মানুষও সেখানে আশ্রয়ের চেষ্টা করছেন।

২৪ বছর বয়সী সুদানি নাগরিক কামাল ওমর জানান, ২০২৩ সালে গৃহযুদ্ধের কারণে তিনি নিজ দেশ ছাড়েন এবং গত বছর মরক্কোয় পৌঁছান। তিনি বলেন, ‘আমি মরক্কোতে ফিরতে চাই না। দয়া করে আমাদের সুরক্ষা দিন।’

এ পর্যন্ত স্পেন সরকার মূলত মরক্কো সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করার কৌশল অনুসরণ করেছে। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানান, সমুদ্রে ভাসমান বয়া বসিয়ে অন্তত দৃশ্যমান একটি সীমান্ত প্রতিবন্ধক তৈরি করা হবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন এই ব্যবস্থা স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার দাবি, ওই রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে মানব পাচারকারীরা বহু মানুষকে সেউতায় প্রবেশে উৎসাহিত করেছে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রপথে আটক হওয়া কোনো অভিবাসী যদি স্পেনের ভূখণ্ডে পৌঁছাতে গিয়ে কোনো সীমান্তপ্রতিবন্ধক অতিক্রম না করেন, তাহলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।

তবে সরকারের এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির শরণার্থী ও অভিবাসী অধিকারবিষয়ক কর্মকর্তা জুডিথ সান্ডারল্যান্ড বলেন, ভাসমান এই প্রতিবন্ধক কার্যকরভাবে কীভাবে পরিচালিত হবে এবং এটি ঘিরে মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি ২০১৪ সালের একটি ঘটনার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন, যখন সেউতায় সমুদ্রপথে প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীদের দিকে স্পেনের সিভিল গার্ড রাবার বুলেট ছুড়েছিল। সেই ঘটনায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *