সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

সালমান শাহ হত্যা: ডনকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিতে চায় সিআইডি

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত সংস্থাটি বলছে, ডনের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে এবং কার ইন্ধনে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন, তা জানার পাশাপাশি মামলার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকার আদালতে এ আবেদন করেন।

প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক শাহ আলম সোমবার (২৪ আগস্ট) জানান, আসামিকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আগামী বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দিন নির্ধারণ করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা।

যে তিন কারণ দেখিয়েছে সিআইডি
রিমান্ড আবেদনে সিআইডি তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে। তদন্ত সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এবং তার মা ১৯৯৬ সাল থেকেই ছেলের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছে সিআইডি।

দ্বিতীয়ত, ডনকে সুকৌশলী ও ধূর্ত প্রকৃতির ব্যক্তি উল্লেখ করে সিআইডি বলেছে, তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের অবস্থান শনাক্ত এবং তাদের গ্রেপ্তারের পথ তৈরি হতে পারে।

তৃতীয় কারণ হিসেবে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও কী কারণে, কোন কৌশলে এবং কার প্ররোচনায় তিনি দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন, এ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার জন্যও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার
গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং একই দিন কারাগারে পাঠানো হয়। ১২ আগস্ট তার জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন।

যে মামলার তদন্তে নতুন মোড়
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। তার মৃত্যুর পর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।

আদালতের নির্দেশে অপমৃত্যুর ঘটনা ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্ত করে সিআইডি। ওই বছরের ৩ নভেম্বর দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।

সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে পরে রিভিশন মামলা করেন সালমান শাহর বাবা। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করেন এবং মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।

এর পরদিন ২১ অক্টোবর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর হত্যা মামলাটি করেন। এতে সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ।

মামলার অভিযোগে যে ঘটনার বর্ণনা
মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীর অভিযোগে উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বোনের স্বামী কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন সালমান ঘুমিয়ে আছেন।

কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু একটা হয়েছে বলে জানান। এরপর তারা বাসায় ফিরে তাকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। কয়েকজন বহিরাগত নারী তখন তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

সালমানের মা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। পথে তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখ ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পাওয়ার কথাও মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন এবং জানান, তিনি আগেই মারা গেছেন।

কবর থেকে দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগ
মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে এর আগে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ২০ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২৪ মে লাশ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেওয়া হয়।

তবে লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে বাদীপক্ষ আবেদন করলে আদালত সেটি নথিভুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে গত ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপিও আদালতে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য রয়েছে। এ অবস্থায় ডনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি হবে ২৭ আগস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *