ক্ষমতায় বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে ব্যর্থতা ও পরিকল্পনাহীনতার সময় হিসেবে মূল্যায়ন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহসহ সরকারের ঘোষিত তিন অগ্রাধিকারের কোনোটিতেই প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। দলের পলিসি ও রিসার্চ-বিষয়ক উপকমিটি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করে।
এ সময় ‘বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোনো রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ ও এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, সরকার পুরোনো ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর দিকেই ফিরে যাচ্ছে। তার ভাষায়, ছয় মাসের কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশ পরিচালনার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যায়নি।
তিন অগ্রাধিকারেই ব্যর্থতার অভিযোগ
এনসিপির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৭ ফেব্রুয়ারির প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে সরকার ১৮০ দিনের জন্য তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিল, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
তবে ছয় মাস পর বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দলটি বলছে, তিন ক্ষেত্রেই সরকার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালানি সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কৃষকদেরও বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট শিল্প ও কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়িয়েছে। একই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে এবং ভোগ্যপণ্য ও আমদানি বাজারে পুরোনো সিন্ডিকেটগুলো আবার সক্রিয় হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতেও আগের লুটেরাদের ফিরে আসার অভিযোগ তুলে এনসিপি বলছে, বাজার সিন্ডিকেটের পুনরুত্থান এবং পাঁচ মাস ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে।
সংস্কার ও বিচার নিয়েও প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ধীরে ধীরে বাতিল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মতো উদ্যোগের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত দুর্বল আইন করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এনসিপির মূল্যায়নে আরও বলা হয়, ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বাড়ছে। জুলাই গণহত্যার বিচারেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করা হয়।
শহীদ পরিবার ও আহতদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনকে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় যথাযথভাবে রাখা হয়নি বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
বিরোধীদের ওপর হামলার অভিযোগ
বিরোধী দল, ভিন্নমত ও সাংবাদিকদের ওপর সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের হামলা ও মামলা বাড়ছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, অনেক ঘটনায় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আহত ব্যক্তিদেরই আইনি হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। পুলিশকে আবারও দলীয় বাহিনীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মাধ্যমে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জুলাই সনদ লঙ্ঘন করেছে বলেও অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
বিরোধী দলকে ‘দুর্বল’ বলার প্রচারণা মানতে নারাজ এনসিপি
সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতেই বিরোধী দলকে দুর্বল বা ব্যর্থ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি দাবি করেন, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট, বিশেষ করে এনসিপি গত ছয় মাসে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে বিরোধী দল ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও এর জবাবে তাদের ওপর হামলা হয়েছে। তিনি গাইবান্ধায় একজনের মৃত্যুসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন।
সরকার একই ধারায় এগোতে থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের গণআন্দোলনের মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম জানান, শিগগিরই ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে পাঁচ থেকে ছয়টি বিভাগে লংমার্চ করা হবে। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশের আয়োজন করা হবে। প্রয়োজন হলে সেখান থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি উপজেলা, জেলা ও মহানগর পর্যায়েও এনসিপির কর্মসূচি চলবে বলে জানান তিনি।
ভারত নিয়ে নাহিদের বক্তব্য
শেখ হাসিনার ভারত অবস্থান নিয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তা ভারত সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের মতে, একই সময়ে আওয়ামী লীগকে ভারতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি পরস্পরবিরোধী।
ভারত শেখ হাসিনাকে আর আশ্রয় দেবে না, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বন্ধ করবে, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান দেখাবে এবং ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফেরত দেবে, এ ধরনের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর গত ১৫ বছরের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের পক্ষে মত দেন তিনি।
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পানির ন্যায্য হিস্যা, সীমান্তে পুশ-ইন বন্ধ ও সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো বিষয়কে ভিত্তি করে ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
তবে শেখ হাসিনা দিল্লিতে থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তা বাংলাদেশের জন্য অবমাননাকর বার্তা দেবে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, এতে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সালেহউদ্দিন সিফাত।








