সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

চার খুনের তদন্তে নতুন মোড়: ইয়াবা সেবনের দাবি, আট দিন পর ডোপ টেস্টে মিলল না মাদকের চিহ্ন

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে হত্যার আগে ইয়াবা সেবনের কথা বলেছিলেন। পুলিশের ভাষ্যেও ছিল, হত্যাকাণ্ডের আগে তারা মাদক সেবন করেছিলেন। কিন্তু ঘটনার আট দিন পর করা ডোপ টেস্টে তাদের শরীরে মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

ফলে তদন্তে এখন সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, হত্যাকাণ্ডের আগে মাদক সেবনের যে দাবি আসামিরা করেছেন, আট দিন পরের ডোপ টেস্টের ফল কি সেটিকে খণ্ডন করছে, নাকি পরীক্ষার সময়ের ব্যবধানের কারণে এই ফল দিয়ে আগের মাদক সেবন সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়?

রোববার রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মূত্রের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা শেষে সোমবার দুপুরে প্রতিবেদন হাতে পায় রংপুর মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। প্রতিবেদনে দুজনের শরীরে মাদকের অস্তিত্ব না পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

রংপুর মহানগর ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, ঘটনার আট দিন পর নমুনা পরীক্ষা করায় মূত্রে মাদকের অস্তিত্ব না পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তার দাবি, ঘটনার দুই-তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা করা হলে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকত।

অর্থাৎ ডোপ টেস্টের ফলটি সরাসরি হত্যাকাণ্ডের আগের মাদক সেবনের দাবিকে যাচাই করছে না, বরং ঘটনার এক সপ্তাহের বেশি সময় পর তাদের শরীরে মাদকের কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট ছিল কি না, সেটিই পরীক্ষায় উঠে এসেছে।

স্বীকারোক্তির সঙ্গে ফলাফলের এই অমিল কেন
পুলিশের আগের বক্তব্য অনুযায়ী, চারজনকে হত্যার আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ মাদক সেবন করেছিলেন। আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতেও তারা হত্যার আগে আট থেকে নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই দাবির আট দিন পর মূত্র পরীক্ষায় কোনো মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এই দুই তথ্যের মধ্যে সাংঘর্ষিকতা আছে কি না জানতে চাইলে উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্তের এই পর্যায়ে তাই ডোপ টেস্টের ফলকে এককভাবে মাদক সেবনের দাবির পক্ষে বা বিপক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ কতটা, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ পুলিশের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, পরীক্ষাটি ঘটনার পরপর হয়নি।

রক্ত বা চুলের নমুনা পরীক্ষার সুযোগও ছিল না
আরেকটি বিষয় তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডোপ টেস্টের জন্য মূত্রের নমুনাই পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে চুল বা রক্তের নমুনা পরীক্ষা করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রোববার ডিবির সদস্যরা একজন টেকনোলজিস্টকে সঙ্গে নিয়ে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। কারাগারের ভেতরেই দুজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের কারাগারের বাইরে এনে পরীক্ষা করাতে গেলে হামলা বা মব তৈরির আশঙ্কা ছিল। সে কারণেই নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কারাগারের ভেতর থেকেই নমুনা নেওয়া হয়।

হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ নিয়েও তদন্তের গুরুত্ব
২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও তাদের দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই ওই চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। পরে গ্রেপ্তার দুজন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। বর্তমানে তারা রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে ডোপ টেস্টের ফল তদন্তে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে, কিন্তু একই সঙ্গে ফলটির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। ঘটনার আট দিন পর মূত্র পরীক্ষায় মাদক না পাওয়ার তথ্য থেকে হত্যার আগের মাদক সেবনের দাবি নিশ্চিত বা অস্বীকার করা যায় কি না, সেটি তদন্তের পরবর্তী ধাপেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।

চারজনের হত্যার ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর নগরের কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছিলেন। সেই মামলার তদন্তের মধ্যেই এখন আসামিদের জবানবন্দি, পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য এবং ডোপ টেস্টের ফল, এই তিন ধরনের তথ্য কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে মেলে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *