মাদারীপুরের কালিকাপুরে ১৮ বছরের আইভী আক্তার নামে এক হত্যার ঘটনায় আপাতত সামনে এসেছে একটি ছোট সময়ের ব্যবধান। সন্ধ্যায় চাচা নামাজ পড়তে বেরিয়েছিলেন, তার স্ত্রী গিয়েছিলেন চিকিৎসকের কাছে। বাড়িতে তখন একাই ছিলেন আইভী। রাত ৮টার দিকে তারা ফিরে দেখেন, ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে তার রক্তাক্ত মরদেহ।
ঘটনার পর আইভীর ব্যবহৃত একটি আইফোনও পাওয়া যায়নি। ফলে শুরুতে ঘটনাটি চুরি করতে ঢুকে হত্যাকাণ্ডের মতো মনে হলেও, পুলিশের তদন্তে ব্যক্তিগত সম্পর্কসহ অন্য সম্ভাবনাও বাদ দেওয়া হচ্ছে না।
মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর এলাকায় মঙ্গলবার সন্ধ্যার কোনো একসময় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। নিহত আইভী আক্তার ওই এলাকার আসলাম শরীফের মেয়ে। প্রায় এক বছর আগে শরীয়তপুর শহরের বাসিন্দা ও কাতারপ্রবাসী মো. ফেরদৌসের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। স্বামী সম্প্রতি কাতারে চলে যাওয়ার পর আইভী বেড়াতে এসেছিলেন চাচা কালাম শরীফের বাড়িতে।
পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে ছোটবেলা থেকেই চাচার বাড়িতে থাকতেন আইভী। সেই বাড়িতেই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাকে একা পেয়ে হামলা চালানো হয়।
যে সময়টুকুতে ঘটল হত্যাকাণ্ড
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যায় কালাম শরীফ নামাজ পড়তে মসজিদে যান। তার স্ত্রীও চিকিৎসকের কাছে মাদারীপুর শহরে ছিলেন। অর্থাৎ ওই সময় বাড়িতে আইভী ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।
এই সুযোগেই দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢোকে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। ধারালো অস্ত্র দিয়ে আইভীর মাথায় আঘাত করা হয়। গুরুতর আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এরপর ঘরে থাকা একটি আইফোন নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
তবে এখানেই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, হত্যার উদ্দেশ্য কি কেবল একটি ফোন নেওয়া?
কারণ, আইভীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যার পর ফোন নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি একদিকে যেমন ছিনতাই বা চুরির সম্ভাবনার কথা বলছে, অন্যদিকে পুলিশ ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে। হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া হচ্ছে না।
গেটের তালা, ভেতরে মরদেহ
রাত ৮টার দিকে বাড়িতে ফেরেন কালাম শরীফ। তার ভাষ্য, মসজিদে যাওয়ার আগে তিনি বাড়ির মেইন গেটে বাইরে থেকে তালা দিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে ঘরের গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান।
কোনো সাড়া না পেয়ে পরে ঘরের ভেতরে গিয়ে মেঝেতে আইভীর রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান তিনি। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন।
ঘটনাটির এই অংশটিও তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাইরে থেকে বাড়ি তালাবদ্ধ থাকা অবস্থায় হামলাকারী কীভাবে ঢুকল এবং কীভাবে বের হলো, এটি এখন তদন্তকারীদের সামনে থাকা প্রশ্নগুলোর একটি। তবে প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে এ বিষয়ে এখনো পুলিশের কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তে চুরি, সম্পর্ক, দুই সম্ভাবনাই
পুলিশ জানিয়েছে, আইভীর মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সুযোগ বুঝে ঘরে ঢুকে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, হত্যার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। চুরি কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় ছাড়াও অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অর্থাৎ এখনো হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেনি পুলিশ।
আইভীর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না, তার ব্যক্তিগত যোগাযোগের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন কি না যার সঙ্গে কোনো বিরোধ তৈরি হয়েছিল, কিংবা ফোনটি কেন নিয়ে যাওয়া হলো, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই খুঁজছে পুলিশ।
তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ফোনটি
আইভীর আইফোনটি হত্যাকাণ্ডের পর পাওয়া যায়নি। ফলে ফোনটি এখন তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। ফোনটি কারও কাছে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, এর শেষ অবস্থান বা যোগাযোগের তথ্য থেকে হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে কার সঙ্গে আইভীর যোগাযোগ ছিল, এসব বিষয় তদন্তকারীরা যাচাই করতে পারবেন।
তবে এসব বিষয়ে পুলিশ এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
এ ঘটনায় বুধবার সকাল পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
১৮ বছরের এক তরুণীর হত্যাকাণ্ডের পেছনে আসলে কী ছিল, একটি ফোনের জন্য পরিকল্পনাহীন হামলা, নাকি এর আড়ালে ছিল অন্য কোনো উদ্দেশ্য, এই প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।








