সৌদি আরবের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের লাখো মানুষের উপস্থিতি। জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে যাওয়া এসব মানুষের অনেকেরই কর্মস্থল নির্মাণশিল্প, কারখানা, পরিবহন, দোকান কিংবা কৃষিখাত। কিন্তু চলতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত তিন মাসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে ১২টি পৃথক ঘটনায় অন্তত ৩৪ বাংলাদেশী নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
তালিকাটি সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ মৃত্যুর পরিসংখ্যান না হলেও সংবাদমাধ্যমে শনাক্ত হওয়া ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে তৈরি একটি ন্যূনতম হিসাব। একই ঘটনার একাধিক প্রতিবেদন বাদ দিয়ে ঘটনাগুলো আলাদা করে হিসাব করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে আগস্ট মাসে। সৌদি আরবের রিয়াদের একটি সোফা কারখানায়। আগুনে মারা যান ১৬ বাংলাদেশী শ্রমিক। এর বাইরে সড়ক দুর্ঘটনা, নির্মাণকাজের দুর্ঘটনা এবং দুটি হত্যাকাণ্ডও রয়েছে।
তিন মাসের হিসাব বলছে কী?
মাসভিত্তিক হিসাব করলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট। তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন মাসে ৩টি ঘটনায় অন্তত তিনজন প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। জুলাই মাসে পৃথক ৪টি ঘটনায় ৮ জনের মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে গণমাধ্যমগুলো। গেল আগস্ট মাসে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গণমাধ্যমগুলো বলছে, ৪টি ঘটনায় ১৯ জন প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ১ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত ১টি ঘটনায় অন্তত ৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশীর প্রাণহানি ঘটে।
অর্থাৎ তিন মাসে মোট ১২টি ঘটনায় ৩৪ জন। মৃত্যুর ধরন বিশ্লেষণ করলে অন্তত ১৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায়, ১৮ জন কর্মস্থল বা কারখানা-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় এবং ২ জন হত্যাকাণ্ডে মারা গেছেন।
কর্মক্ষেত্রের মৃত্যুর বড় অংশই এসেছে একটি ঘটনা থেকে, রিয়াদের সোফা কারখানার অগ্নিকাণ্ড। সেখানে একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন।
জুনেই শুরু, জুলাইয়ে বাড়ে প্রাণহানি
১৭ জুন আল-জউফে কৃষি খামারে কাজ শেষে ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় মারা যান ফরিদপুরের গিয়াস উদ্দিন শিকদার (৬০)। এর মাত্র তিন দিন পর, ২০ জুন সৌদি আরবে একটি ভবনে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মহিন উদ্দিন ভুঁইয়া।
২১ জুন কর্মস্থলে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের ২৪ বছর বয়সী নাহিদ হাসান শান্ত।
জুলাইয়ে প্রাণহানির পরিমাণ আরও বাড়ে!
৪ জুলাই রিয়াদের অলাইয়া এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের ফাঁকা শ্যাফটে পড়ে মারা যান জয় আহমদ ও মোহাম্মদ মোতাহার হোসাইন। দুজনই একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তাদের মরদেহ ১৭ জুলাই বাংলাদেশে পৌঁছায়। ১৩ জুলাই বাহদাহ এলাকায় ডিউটি শেষে ফেরার সময় দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় মারা যান কুমিল্লার তোফায়েল হোসেন (৩২)।
১৫ জুলাই রিয়াদ থেকে জেদ্দা যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান দুই সহোদর ফয়েজ আহমেদ সজীব (২৯) ও ফরহাদ হোসেন সুজন (২১)। ২৮ জুলাই তাদের পাশাপাশি দাফন করা হয়।
এর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর, ২৩ জুলাই ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে রিয়াদ থেকে মক্কার পথে থাকা একটি পরিবার ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। পেছন থেকে একটি ভারী যান তাদের গাড়িকে ধাক্কা দিলে তানিয়া তাহমিনা রিনা (৪৫) এবং তার দুই সন্তান তাসবিক ও জারা মারা যায়। আহত হন পরিবারের অন্য সদস্যরা।
আগস্টে এক ঘটনাতেই ১৬ মৃত্যু
আগস্টের ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ৯ আগস্টের অগ্নিকাণ্ড। রিয়াদের শিফা/মানফুয়া এলাকার একটি সোফা কারখানায় আগুনে ১৬ বাংলাদেশী শ্রমিকের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে আগুনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কথা বলা হয়েছিল।
এই ঘটনার পর মরদেহ শনাক্ত করতেও সময় লেগেছে। প্রথম ধাপে নয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের মরদেহ ২৭ আগস্ট বাংলাদেশে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে আত্রাইয়ের সাতজন, নাটোরের নলডাঙ্গার একজন এবং রাজশাহীর বাগমারার একজন ছিলেন।
বাকি সাতজনের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১৬ জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। তবে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশ্য সংবাদে বাকি সাতজনের মরদেহ বাংলাদেশে ফেরানোর নির্ভরযোগ্য তারিখ পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনায় আরেকটি বিষয়ও নজরে আসে, ঘটনার শুরুর দিকের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ও জেলা পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পার্থক্য ছিল। পরবর্তী সরকারি/দূতাবাস-ভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে ১৬ জনের সংখ্যা নিশ্চিত হয়।
দুর্ঘটনার বাইরে দুই হত্যাকাণ্ড
এই সময়ের সব মৃত্যু যে দুর্ঘটনাজনিত, তা নয়। ৪ আগস্ট রিয়াদের হারা এলাকায় নিজ বাসায় গাজী জাকির হোসেনকে গলা কেটে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরিবারের পক্ষ থেকে তার কাছে থাকা অর্থ লুটের কথাও জানানো হয়। ঘটনার ২২ দিন পর, ২৭ আগস্ট তার মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছায়।
আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে ৩০ আগস্ট তায়েফের হাওয়াইয়া এলাকায়। সেখানে এক সৌদি তরুণের গুলিতে নিহত হন কামরুল জামান। পরে ওই হামলাকারী নিজেও আত্মহত্যা করে। ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী কামরুলের মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছিল।
আগস্টের আরও দুটি সড়ক দুর্ঘটনা
১০ আগস্ট জিজানে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ইলেকট্রিক বাইকে থাকা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের জাকির হোসেনকে পেছন থেকে একটি মালবাহী গাড়ি ধাক্কা দেয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ১৫ আগস্ট মদিনায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান চট্টগ্রামের রাউজানের নুরুল মোস্তফা রাফাত (২৮)। তিনি একটি গ্রোসারি দোকানে কাজ করতেন।
দেশে ফেরার পথেও মৃত্যু
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ঘটনাটি এই তালিকায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ৭ সেপ্টেম্বর তায়েফের আল-খুরমা এলাকায় জেদ্দা বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় চার বাংলাদেশী মারা যান। তাদের মধ্যে আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে; অপর দুজনের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছিল।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়, তারা সৌদি আরবে দীর্ঘদিন থাকার পর দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং বিমানবন্দরের পথেই দুর্ঘটনার শিকার হন। ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছায়নি।
মৃত্যুর পরও আরেক লড়াই: মরদেহ ফেরত
এই তিন মাসের ঘটনাগুলো শুধু মৃত্যুর সংখ্যাই দেখায় না; মরদেহ দেশে ফেরানোর জটিলতাও সামনে আনে। কোনো কোনো মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরেছে, আবার কোনো ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ লেগেছে। জাকির হোসেনের মরদেহ দেশে পৌঁছাতে ২২ দিন লেগেছে। সোফা কারখানার আগুনে নিহত ১৬ জনের ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত করতেই ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়েছে।
আবার জুন ও জুলাইয়ের কয়েকটি ঘটনায় প্রকাশ্য সংবাদে মরদেহ দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি।
এখানে একটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি, মৃত্যুর তারিখ এবং মরদেহ দেশে ফেরার তারিখ এক নয়। ফলে শুধু দেশে মরদেহ আসার খবর ধরে প্রবাসী মৃত্যুর সময়কাল হিসাব করলে প্রকৃত চিত্র বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়
এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো প্রতিটি ঘটনার আলাদা ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।
নির্মাণকাজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কর্মস্থলে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জরুরি নিরাপত্তা প্রটোকল কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? সড়কে কর্মস্থলে যাতায়াতকারী প্রবাসীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? আর বড় কোনো দুর্ঘটনার পর মরদেহ শনাক্ত ও দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় কোথায় কোথায় সময় লাগছে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই মৃত্যুগুলোর কতগুলো নিছক অনিবার্য দুর্ঘটনা, আর কতগুলো যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে এড়ানো সম্ভব ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা গোনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সৌদি আরবে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, নিয়োগকর্তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবহনব্যবস্থা, দুর্ঘটনার তদন্ত এবং দূতাবাসের সহায়তা ব্যবস্থার আরও গভীর অনুসন্ধান। কারণ ৩৪টি মৃত্যু শেষ পর্যন্ত শুধু ৩৪টি সংখ্যা নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন এবং দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।








