মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

বার সভাপতির সঙ্গে কথাকাটাকাটি, প্রধান বিচারপতির এজলাস ছাড়ার নেপথ্যে কী?

এক মামলায় নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা খরচা (কস্ট) আরোপের আদেশকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের কথোপকথনের একপর্যায়ে এজলাস ত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচ বিচারপতি।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ১ নম্বর এজলাসে এ ঘটনা ঘটে। এরপর ওই এজলাসে আর আদালতের কার্যক্রম বসেনি বলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনার পর মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল পৃথক ব্রিফিংয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। তবে দুই পক্ষের বক্তব্যে ঘটনার প্রেক্ষাপট ও কথোপকথনের উপস্থাপনায় পার্থক্য রয়েছে।

যে মামলার আদেশ ঘিরে শুরু
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে একজন কাজি নিয়োগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই মামলার সূত্রপাত। একই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে মামলার বাদী পাঁচটি রিট করেছিলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেলের দাবি, পরবর্তী রিটগুলোতে আগের রিট খারিজ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। তার ভাষায়, বিষয়টি আদালতের কাছে ‘সিরিয়াস ফ্রড’ হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ায় আপিল বিভাগ নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে আরও পাঁচ লাখ টাকা খরচা আরোপ করেন। এই অর্থ সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে ওই মামলার আদেশ দেওয়া হয়। নারী আইনজীবী তখন আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তার পাশেই বসেছিলেন। তবে মাহবুব উদ্দিন খোকন তখন আদালতে ছিলেন না।

দুপুরে প্রসঙ্গটি আবার ওঠে
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটের দিকে অন্য একটি মামলার শুনানির সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন সকালে দেওয়া ওই আদেশের প্রসঙ্গ তোলেন।

তিনি বলেন, একজন আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা ‘ফাইন’ করা হয়েছে।

এর জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আদালত সবকিছু বিবেচনা করেই আদেশ দিয়েছেন এবং সেটি পরিবর্তন করা হবে না। অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালত মনে করেছে মামলায় আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে এবং আপিল বিভাগের আগের আদেশও গোপন বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ সময় প্রধান বিচারপতি মাহবুব উদ্দিন খোকনকে ওই প্রসঙ্গ না তোলার জন্য বলেন। এরপরই পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয় বলে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য।

‘প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে’
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহবুব উদ্দিন খোকন তখন বলেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’

প্রধান বিচারপতি বিষয়টি প্রথমে হালকাভাবে নেন এবং খোকনকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কথাটি এ অর্থেই বলেছেন কি না।

রুহুল কুদ্দুস কাজলের দাবি, খোকন একই বক্তব্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি মন্তব্যটিকে ‘অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল’ বলে উল্লেখ করেন।

এরপর প্রধান বিচারপতি বলেন, তিনি আর ওই দিনের আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। এই কথা বলেই তিনি এজলাস ত্যাগ করেন। তার সঙ্গে আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরাও এজলাস ছাড়েন। এরপর ওই এজলাসে আর আদালতের কার্যক্রম হয়নি।

খোকনের বক্তব্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা
ঘটনার পর হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

তার বক্তব্য, সকালে আপিল বিভাগের প্রথম মামলায় একজন নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া হয়। এরপর কার্যতালিকার ১৩ নম্বর মামলা শেষ হলে তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে বিষয়টি বিনয়ের সঙ্গে তুলে ধরেন।

খোকন বলেন, তিনি মূলত ওই নারী আইনজীবীর ওপর আরোপ করা পাঁচ লাখ টাকা কস্ট মওকুফের অনুরোধ করেছিলেন।

তার ভাষ্য, তিনি আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন মূলত আপিল বিভাগে মামলার সংখ্যা ও বেঞ্চসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে।

‘আগে তিনটি বেঞ্চ ছিল, এখন একটি’
মাহবুব উদ্দিন খোকনের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন এবং তিনটি বেঞ্চে মামলা চলত। এখন একটি বেঞ্চ থাকায় মামলা নিষ্পত্তির গতি কমেছে।

তিনি বলেন, কোনো মামলায় স্টে হলে তার শুনানি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। এমনকি চেম্বার আদালতে স্টে হওয়ার পরও সেটি শুনানির জন্য প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

কজলিস্টে থাকা মামলার অবস্থান পরিবর্তন এবং শুনানির সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

খোকনের বক্তব্য, মামলা হলে আইনজীবীদের আয় হবে, কম হোক বা বেশি। আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের স্বার্থের বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে তুলে ধরা তার দায়িত্ব।

তিনি বলেন, ‘আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম। আমি চিন্তা করিনি যে উনি এত রিঅ্যাক্ট করবেন।’

খোকনের মতে, বিচারকদের রাগ-অভিমানের ঊর্ধ্বে থেকে বিচার করার কথা এবং আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তার পক্ষ থেকে আবেদন রাখার একটি দায়িত্ব রয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনেলের পাল্টা বক্তব্য
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল অবশ্য খোকনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, খোকন আইনজীবীদের কল্যাণ ও স্বার্থে কিছু কথা প্রধান বিচারপতির কাছে বলেছেন বলে দাবি করলেও ওই মামলার কার্যধারায় এমন কোনো কথা হয়নি।

প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা ও সততাকে গুরুত্ব দেন উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আদালতের সঙ্গে কোনো প্রতারণা হয়েছে বলে মনে হলে প্রধান বিচারপতি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকা কস্ট আরোপের পেছনে আদালতের কাছে মামলার পূর্ববর্তী আদেশ গোপন করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ঘটনাটি যে প্রশ্ন রেখে গেল
একজন নারী আইনজীবীর ওপর পাঁচ লাখ টাকা কস্ট আরোপের আদেশ নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের এজলাস ত্যাগের ঘটনায় গড়িয়েছে।

একদিকে আইনজীবী সমিতির সভাপতি বলছেন, তিনি আইনজীবীদের স্বার্থে মামলা কমে যাওয়া, বেঞ্চসংখ্যা এবং আয় কমার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য, এমন বক্তব্য ওই মামলার কার্যধারায় হওয়ার কথা নয় এবং প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পৌঁছায়।

দুই পক্ষের বক্তব্যের এই পার্থক্যের মধ্যেই মঙ্গলবারের এজলাস ত্যাগের ঘটনা ঘটেছে।

ঘটনার পর আপিল বিভাগের ওই এজলাসে আর কার্যক্রম না বসায় স্বাভাবিকভাবেই আদালতের পরিবেশ ও বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *