ইউরোপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে গ্রিস। কৃষি, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীর চাহিদা থাকায় বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন দেশটির নিয়োগকর্তারা। কিন্তু চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেই বাজারে জায়গা করে নিতে পারছে না বাংলাদেশ। কর্মী নিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ফিলিপাইন, ভারত ও নেপাল। বিপরীতে ভিসা জটিলতায় আটকে যাচ্ছে বাংলাদেশিদের বিদেশযাত্রা।
এর একটি উদাহরণ ইমন মিয়া। গ্রিসের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিটও পেয়েছিলেন তিনি। চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিলেন। বাকি ছিল শুধু ভিসা পাওয়া। কিন্তু গ্রিসের ভিসার সাক্ষাৎকার দিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে যাওয়ার জন্য ভারতীয় ভিসা না পাওয়ায় তার আর গ্রিসে যাওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয় চাকরির সুযোগ।
ইমনের মতো অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীর ক্ষেত্রেই একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। নিয়োগকর্তার কাছ থেকে কাজের অনুমতি পাওয়ার পরও ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে গ্রিসে পৌঁছাতে পারছেন না তারা। এতে একদিকে ব্যক্তিগত কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত শ্রমবাজারের অংশও চলে যাচ্ছে প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে।
পরিসংখ্যানে পিছিয়ে পড়ার চিত্র
গ্রিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যখন কর্মী পাঠানোর নির্ধারিত সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না, তখন অন্য দেশগুলো থেকে নিয়োগ বাড়াচ্ছে গ্রিস।
২০২৫ সালে ফিলিপাইন থেকে কর্মী পুনর্নিয়োগের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৬৪৩। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৭৯। ভারত থেকে একই সময়ে কর্মী পুনর্নিয়োগ ৭ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৯৪৭। নেপাল থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী নিচ্ছে দেশটি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও গ্রিসের শ্রমচুক্তির আওতায় দুই বছরে ৮ হাজার কর্মী পাঠানোর সুযোগ থাকলেও বৈধ পথে গ্রিসে গেছেন ৫০০ জনেরও কম।
এই ব্যবধানের পেছনে বড় বাধা হিসেবে সামনে এসেছে ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা। অর্থাৎ গ্রিসে কাজের সুযোগ তৈরি হলেও সেই সুযোগকে বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ দিতে পারছে না বাংলাদেশ।
দিল্লির একটি ভিসাই আটকে দিচ্ছে বিদেশযাত্রা
বাংলাদেশে গ্রিসের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস না থাকায় ভিসার জন্য আবেদনকারীদের ভারতের নয়াদিল্লির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, গ্রিসের ভিসার সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে আবেদনকারীদের দিল্লিতে যেতে হয়। কিন্তু সেখানে যেতে প্রয়োজন ভারতীয় ভিসা। এই ভারতীয় ভিসা পাওয়ার অনিশ্চয়তা থেকেই শুরু হচ্ছে জটিলতা।
একজন কর্মী নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে সাক্ষাৎকার দিতে না পারলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া ঝুঁকির মুখে পড়ে। কারণ, গ্রিসের নিয়োগকর্তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মী চান। বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠাতে দেরি হলে তারা বিকল্প দেশ থেকে লোক নিয়োগ করছেন।
ফলে সমস্যাটি কেবল ভিসা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপরও।
চাহিদা আছে, কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না: রাষ্ট্রদূত
গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য গ্রিসে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কৃষি খামার থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁর মালিকেরা নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তার মতে, বাংলাদেশিরা কাজেও দক্ষ। কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে গ্রিসের এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
রাষ্ট্রদূত জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রায় প্রতি মাসেই গ্রিসের পররাষ্ট্র ও অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি। বাংলাদেশে নিয়মিত গ্রিক কনস্যুলার টিম পাঠানো কিংবা অন্য কোনো দেশের গ্রিক দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদন গ্রহণের সুযোগ তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা বৈধভাবে গ্রিসে যেতে আগ্রহী হলেও ভারতীয় ভিসা না পাওয়ায় অনেকেই দিল্লিতে যেতে পারছেন না। অন্যদিকে গ্রিক নিয়োগকর্তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মী চান। সময়মতো কর্মী সরবরাহ করতে না পারলে তারা অন্য দেশ থেকে লোক নিয়োগ করেন।
শ্রমচুক্তি আছে, বাস্তবায়নে ঘাটতি
২০২২ সালে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, প্রতিবছর সর্বোচ্চ চার হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ দুই বছরে সর্বোচ্চ আট হাজার কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু চুক্তির এই সুযোগ বাস্তবে কাজে লাগানো যায়নি। বৈধ পথে ৫০০ জনেরও কম কর্মী গ্রিসে যেতে পারায় নির্ধারিত সুযোগের বড় অংশই অব্যবহৃত রয়ে গেছে।
এতে বাংলাদেশের কর্মীরা যেমন ইউরোপের একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ হারাচ্ছেন, তেমনি গ্রিসের নিয়োগকর্তারাও কর্মী সংগ্রহে অন্য দেশের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছেন।
সমাধান কোথায়?
সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রিসের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে প্রথমেই ভিসা প্রক্রিয়ার বাধা দূর করতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশে নিয়মিত গ্রিক কনস্যুলার কার্যক্রম চালু, বিকল্প কোনো দেশে ভিসা আবেদন ও সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার পরও যেন একজন কর্মী শুধু ভারতীয় ভিসার অভাবে চাকরির সুযোগ হারিয়ে না ফেলেন, সে বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
গ্রিসে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান শ্রমচুক্তির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিসা প্রক্রিয়াই এখন বড় প্রতিবন্ধকতা। দ্রুত সমাধান না এলে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বেশি প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।








