রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

সবশেষ

সৌদিতে প্রাণ গেল একমাত্র উপার্জনক্ষম জসিমের, তিন মেয়েকে নিয়ে দিশাহারা স্ত্রী

পরিবারের কাছে প্রায় চার লাখ টাকা পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়ে সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকায় এক সহকর্মীর সঙ্গে বের হয়েছিলেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার প্রবাসী জসিম উদ্দিন। এরপর হঠাৎই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার। স্বজনেরা যখন তার সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষায়, তখন জসিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকেই পরিবারের কাছে আসে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবি। কয়েক দিন পর একটি মরুভূমি থেকে উদ্ধার হয় বালুচাপা অবস্থায় তার মরদেহ।

ঘটনার পর হত্যার অভিযোগে সাব্বির নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে সৌদি পুলিশ। তবে কীভাবে জসিমের মৃত্যু হয়েছে, মুক্তিপণ দাবির সঙ্গে কারা জড়িত এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো সামনে আসেনি। এদিকে নিখোঁজ হওয়ার ৪১ দিন পর শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশে ফিরেছে জসিমের মরদেহ। তার মৃত্যুতে তিন কন্যাকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবার।

টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আর ফেরেননি
নিহত জসিম উদ্দিন মতলব উত্তর উপজেলার ঘাসিরচর গ্রামের আইয়ুব আলীর ছেলে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকায় প্রায় চার লাখ টাকা দেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে এক সহকর্মীর সঙ্গে বের হন তিনি। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

জসিমের নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকেই স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই ফোন ব্যবহার করে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল।

পরিবারের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে এই ঘটনা। কারণ, যার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না, তার ফোন থেকেই টাকা দাবি করা হচ্ছিল। এর কয়েক দিন পর আল কাসিমের একটি মরুভূমি থেকে বালুর নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায় জসিমের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ।

সহকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সাব্বির
জসিমের মৃত্যুর ঘটনায় সাব্বির নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে সৌদি পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, জসিমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে মরদেহ মরুভূমির বালুর নিচে চাপা দেওয়া হয়েছিল। পরে তার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না এবং মুক্তিপণ দাবির সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা কতটুকু, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সৌদি পুলিশের তদন্তের ফল এবং সংশ্লিষ্ট নথি সামনে এলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।

এ ঘটনায় বাংলাদেশে মতলব উত্তর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।

৪১ দিনের অপেক্ষার অবসান, তবে পরিবারের সংকট কাটেনি
জসিমের মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। পরে মরদেহ দেশে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন যুব অধিকার পরিষদের নেতারা।

সংগঠনটির নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের উদ্যোগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। শনিবার ৪১ দিন পর জসিমের কফিনবন্দী মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা।

জানাজা শেষে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

তিন মেয়েকে নিয়ে এখন কীভাবে চলবে সংসার?
জসিম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী রুমা আক্তার তিন কন্যাকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। দীর্ঘদিনের প্রবাসজীবনের উপার্জনে যে সংসার চলত, সেই সংসারের দায়িত্ব এখন একাই সামলাতে হবে তাকে।

স্বামীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন রুমা আক্তার। একই সঙ্গে তিন মেয়ের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

জসিমের মরদেহ দেশে ফিরেছে, শেষ বিদায়ও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তার পরিবারের কাছে এখনো দুটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে, স্বামীর হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন ও জড়িতদের বিচার এবং তিন কন্যার ভবিষ্যৎ কীভাবে নিশ্চিত হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *