ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন থামেনি। বরং মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা আসার দিনেই রাজধানীর মিরপুরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
রোববার সকালে মিরপুর-১০ নম্বর মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বেলা সোয়া ১১টার দিকে সংঘর্ষ শুরু হয়ে দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত চলে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের অভিযানে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হলেও পরে বিভিন্ন দিক থেকে আবার সংগঠিত হয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
সড়ক ছাড়তে বলার পরই উত্তেজনা
রোববার সকাল ৮টার দিকে মিরপুরের কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে মিরপুর-১০ নম্বর মোড়ে জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ বারবার শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করছিল। কিন্তু বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পুলিশ প্রথমে লাঠিপেটা করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। পরে জলকামান থেকে পানি ছোড়া, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করা হয়। পুলিশের ধাওয়ায় শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হলেও কিছুক্ষণ পর আবার বিভিন্ন দিক থেকে একত্র হয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
মিরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম জানান, মিরপুরের কয়েকটি স্থান থেকে পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সকালে এসে মিরপুর-১০ নম্বর মোড়ে অবস্থান নেন। তাদের অবরোধের কারণে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
আন্দোলনের প্রভাব মেট্রোরেলেও
শ্রমিকদের অবরোধে শুধু সড়ক পরিবহন নয়, মেট্রোরেল চলাচলের যাত্রীসেবাও প্রভাবিত হয়। নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোস্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এতে ওই স্টেশন ব্যবহার করতে আসা যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। একজন যাত্রী জানান, স্টেশনের গেট বন্ধ থাকায় তিনি সেখানে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে কাজীপাড়া স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে ওঠেন।
আগের দিনও তিন ঘণ্টা অচল ছিল মিরপুর
শ্রমিকদের এই বিক্ষোভ এক দিনের ঘটনা নয়। একই দাবিতে শনিবারও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকেরা। তাদের অবরোধে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
পরে শ্রমিকেরা মিরপুর-১ নম্বরের শাহ আলী এলাকায় জড়ো হন। সেখানে কয়েকটি মার্কেট ও পোশাক কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে শ্রমিকদের হাতাহাতি, সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ ছাড়া কালশী এলাকায় একটি পোশাক কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।
পরপর দুই দিনের এসব ঘটনায় মিরপুরের শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা, তবু কেন রাজপথে শ্রমিকেরা?
শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যেই নতুন মজুরি নির্ধারণে রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে রোববারই বোর্ড গঠন করা হবে। মন্ত্রী আরও বলেন, এ অবস্থায় শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই।
তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি ঘিরে তাদের বিক্ষোভ দ্বিতীয় দিনেও সড়কে গড়িয়েছে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে।
মজুরি বোর্ড গঠনের পর নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয় এবং শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে তার কতটা সামঞ্জস্য তৈরি হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।








