রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন ঘিরে তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক সংকট। একদিকে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সড়কে অবস্থান নিয়েছেন হাজারো শ্রমিক, অন্যদিকে তাদের সরিয়ে দিতে পুলিশের অভিযান ঘিরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকায়। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বন্ধ রাখতে হয়েছে মেট্রোরেলের গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্টেশন। ফলে শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলন এখন শুধু সড়ক অবরোধে সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে নগরীর স্বাভাবিক চলাচলেও।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সোয়া ১০টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনস্থলে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার শ্রমিক অবস্থান করছিলেন। তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সংঘর্ষ চলাকালে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে শ্রমিকদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এলাকায় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।
শুধু মিরপুর-১১ নয়, সংঘর্ষের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে পল্লবীর কালশী সড়কেও। সেখানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। কয়েকজন শ্রমিককে পুলিশ সদস্যদের মারধর করতেও দেখা যায়।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন জানান, সড়কে শ্রমিকদের অবরোধ করতে দেওয়া হচ্ছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিরপুর-১১ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এখনো ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে।
মেট্রোরেলের দুই স্টেশনে কেন বন্ধ হলো যাত্রাবিরতি?
শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়ে মেট্রোরেল ব্যবস্থায়। আন্দোলনকারীদের একাংশ মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশনের নিচে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত কাঠ ও বাঁশে আগুন ধরিয়ে দিলে নিচের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর পরপরই নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ স্টেশনে ট্রেনের যাত্রাবিরতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সূত্র জানায়, মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিট থেকে স্টেশন দুটিতে ট্রেন থামানো বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ রাখা হয়েছে স্টেশনগুলোর সব প্রবেশপথ। ফলে এসব স্টেশন থেকে কোনো যাত্রী মেট্রোরেলে উঠতে বা নামতে পারছেন না।
ডিএমটিসিএল সূত্রের ভাষ্য, মেট্রোরেল পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্টেশন দুটি বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সেই পরামর্শের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ পুরো মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। শুধু মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ স্টেশন এড়িয়ে যাচ্ছে ট্রেন। অর্থাৎ অন্য স্টেশনগুলোতে যাত্রী ওঠানামা স্বাভাবিক রয়েছে।
আগেও বন্ধ হয়েছিল একাধিক স্টেশন
মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে মেট্রোরেল স্টেশনে যাত্রাবিরতি বন্ধের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত রোববারও কাজীপাড়া, মিরপুর-১০ ও পল্লবী স্টেশনে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়েছিল।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ এ ব্যবস্থাকে ‘স্টেশন স্কিপ’ হিসেবে উল্লেখ করে। এ প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট কয়েকটি স্টেশনে ট্রেন থামে না, তবে পুরো রুটে ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকে।
এদিকে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে মঙ্গলবার তৃতীয় দিনের মতো মিরপুরে সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। তাদের দাবিকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলন, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং মেট্রোরেলের স্টেশন বন্ধের ঘটনা মিলিয়ে পুরো এলাকায় অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও কখন স্বাভাবিক হবে মিরপুরের সড়ক ও গণপরিবহন চলাচল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।








