দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এখন প্রবাসী আয়। গত ১৫ বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে প্রবাসী আয় ছিল ১০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই তা ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা থেকে শুরু করে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বাজেটে প্রবাসীদের জন্য বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, যাদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, সেই প্রবাসীদের কল্যাণে বরাদ্দ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তবে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
কোন কোন খাতে বাড়তি গুরুত্ব চায় মন্ত্রণালয়?
মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসীদের জন্য কয়েকটি সেবা ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী কার্ড চালু ও সম্প্রসারণ
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য বহুমুখী সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রবাসী কার্ড কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি সেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি
বিদেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়লেও এখনো অনেক কর্মী প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। এজন্য কারিগরি ও ভাষাগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও মেডিকেল সুবিধা
প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বাজেট আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। বিদেশে থাকা কর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং দেশে ফেরার পর চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন
চুক্তি শেষ হওয়া বা বিভিন্ন কারণে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য নতুন উদ্যোগ নিতে চায় সরকার। এজন্য পুনর্বাসন কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি
প্রবাসীদের অভিযোগের বড় একটি অংশ দূতাবাস ও মিশনগুলোর জনবল সংকট নিয়ে। এই সমস্যা কাটাতে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সংখ্যা ও সেবার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে জরুরি সহায়তা, আইনি সেবা ও কনস্যুলার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওয়ান-স্টপ সেবা চালু
প্রবাসীদের নানা ধরনের সেবা এক জায়গা থেকে দেওয়ার লক্ষ্যে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশযাত্রা, অভিযোগ নিষ্পত্তি, কল্যাণ সুবিধা ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত সেবা সহজ হবে।
বিমানবন্দরে প্রবাসী ডেস্ক সম্প্রসারণ
দেশে ফেরত আসা প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরে সহায়তা সেবা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে আসন্ন জাতীয় বাজেটে। বিশেষ করে হয়রানি কমানো, তথ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রবাসী ডেস্কের কার্যক্রম বিস্তৃত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীরা বলছেন, শুধু প্রশিক্ষণ নয়, তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদেশে মৃত্যুবরণকারী কর্মীদের মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা বীমা চালু এবং প্রবাসী পরিবারের সন্তানদের জন্য জেলা পর্যায়ে ছাত্রাবাস নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের।
তাদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে অবদান অনুযায়ী প্রবাসীদের জন্য আরও শক্তিশালী কল্যাণ কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
বাজেট বরাদ্দের চিত্র কী বলছে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোর বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত বরাদ্দের তুলনায় সংশোধিত বাজেট অনেক সময় কমেছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে।
তার মধ্যে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ১ হাজার ১৮ কোটি টাকা, যা পরে সংশোধিত হয়ে দাঁড়ায় ৭০৭ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রস্তাবিত ১ হাজার ২১৭ কোটি টাকা সংশোধিত হয়ে হয় ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রস্তাবিত ৮৫৫ কোটি টাকা পরে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩০ কোটি টাকা।
তবে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির তুলনায় এই বরাদ্দ এখনও যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসীদের কল্যাণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সংকটকালীন সহায়তার জন্য বাজেটে আরও বড় বরাদ্দ প্রয়োজন। তারা বলছেন, প্রবাসী কল্যাণ ফান্ডের ওপর নির্ভর না করে সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকেই অধিকাংশ সেবা পরিচালনা করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রশিক্ষক তৈরি, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু, বিদেশে কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দেশে ফেরার পর পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জনবল ও সেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
অর্থনীতির নেপথ্যের যোদ্ধাদের জন্য কতটা সুখবর?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসী কার্ড, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, ঋণ সহায়তা, ওয়ান-স্টপ সেবা এবং বিদেশে মিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তবে প্রবাসীদের প্রত্যাশা আরও বড়। তারা চান কল্যাণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়গুলোও বাজেটে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হোক।
কারণ দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য বাজেটের অঙ্ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের জীবনের নিরাপত্তা, সেবা এবং সম্মান নিশ্চিত করা।








