মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সবশেষ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি, ইসরায়েল কী মানবে নাকি লঙ্ঘন করবে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি নতুন সমঝোতার ঘোষণা সামনে আসার পর ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গন ও নিরাপত্তা মহলে ব্যাপক অস্বস্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে লেবাননসহ আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধের প্রস্তাবকে ঘিরে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে আপত্তি তুলেছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রোববার গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের পর গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছিল। চুক্তি বাস্তবায়নে তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেছেন শাহবাজ শরিফ। তিনি জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ সমঝোতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে “সম্পূর্ণ” বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি জানান, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধের বিষয়টি ইসরায়েলি নেতৃত্ব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই চুক্তির শর্ত ইসরায়েলের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এমন অবস্থানের মধ্যেই সোমবার দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো প্রকাশ্যে চুক্তি নিয়ে মন্তব্য না করলেও তিনি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে, লেবাননসংক্রান্ত ইরানি শর্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং ইসরায়েল নিজেকে এই সমঝোতার দ্বারা আবদ্ধ মনে করে না।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও একই অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার বক্তব্য, লেবানন, সিরিয়া ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে ইসরায়েলি সেনারা অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান করবে। পাশাপাশি এসব এলাকায় থাকা বেসামরিক স্থাপনাগুলোর একটি অংশকে ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ আখ্যা দিয়ে সেগুলো ধ্বংস করার কথাও বলেন তিনি।

চুক্তির বিরোধিতায় সবচেয়ে সরব কণ্ঠগুলোর একটি এসেছে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের কাছ থেকে। তিনি এক্সে দেওয়া পোস্টে দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতা শুধু ইসরায়েলের নয়, পুরো মুক্ত বিশ্বের স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর। তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র; তাই ওয়াশিংটনের কোনো চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশটির ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। তার ভাষায়, এই সমঝোতা ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।

সরকারের অন্যান্য সদস্যরাও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়লে ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর বলেন, ইসরায়েলের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা। প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চুক্তিকে কেন্দ্র করে শুধু সরকারপক্ষ নয়, ডানপন্থী গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। চ্যানেল ১৪ নিউজের সাংবাদিক ইনন মাগাল অভিযোগ করেন, ইরান ও লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলকে একা ফেলে দেওয়া হয়েছে। একই চ্যানেলের আরেক সাংবাদিক শিমন রিকলিন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইসরায়েল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরাম’ (আইডিএসএফ) এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি বহন করে। সংগঠনটির মতে, লেবানন ও ইরান থেকে উদ্ভূত হুমকির বিষয়ে ইসরায়েলের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত হবে না।

অন্যদিকে বিরোধী শিবিরও সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা জোরদার করেছে। মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটসের’নেতা ইয়ার গোলান বলেন, নতুন সমঝোতা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করতে পারেনি। বরং এটি নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ভুল নীতির ব্যর্থতাকেই সামনে এনেছে।

সাবেক সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী গাদি আইজেনকোটের মতে, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি সাম্প্রতিক বছরগুলোর যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সরকারের ব্যর্থতার ফল বলে উল্লেখ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও নেতানিয়াহু প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম হয়ে পড়েছে এবং দেশকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়িষ্ণু সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে ইরানের নেতৃত্ব মোকাবিলায় ভিন্ন কৌশল গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ঘোষণার পর যেখানে এক পক্ষ এটিকে কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে, সেখানে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলের বড় অংশ চুক্তিটিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। বিশেষ করে লেবানন ও ইরান-সম্পর্কিত নিরাপত্তা প্রশ্নে দেশটির অবস্থান যে অপরিবর্তিত রয়েছে, সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়াগুলোতে সেটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *