ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ছাত্র-যুব বিক্ষোভ সোমবার এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে বহুস্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। একই সময়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সোমবার যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ সমবেত হন। সম্ভাব্য উত্তেজনার আশঙ্কায় আগে থেকেই কয়েক স্তরের ব্যারিকেড বসানো, প্রায় তিন হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হলেও বিক্ষোভকারীদের অগ্রযাত্রা থামানো যায়নি।
দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, নেতৃত্বহীন এই মিছিল যন্তর মন্তর থেকে রাইসিনা মার্গ হয়ে সংসদ ভবনের দিকে এগিয়ে যায়। শুরুতে পুলিশ তেমন বাধা দেয়নি। একপর্যায়ে সংসদের দিকে যাওয়া প্রায় সব সড়কই বিক্ষোভকারীতে পূর্ণ হয়ে যায়। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই এই ঘটনা ঘটে। পরে সংসদ প্রাঙ্গণ থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে বাস আড়াআড়িভাবে রেখে পথ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ।
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদ ভবন ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দেয় অনলাইনভিত্তিক যুব সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সেই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন।
এর আগে, আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেছিলেন অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। টানা ২০ দিনের অনশনের পর গত ১৮ জুলাই ভোরে পুলিশ তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই ঘটনাই বিক্ষোভে নতুন গতি এনে দেয় এবং তার প্রতি সংহতি জানিয়ে শত শত মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন।
বিক্ষোভের ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে সরকারের অবস্থানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়। গোয়েন্দা সূত্র থেকে রোববার সন্ধ্যায় আন্দোলনস্থলে জনসমাগম দ্রুত বাড়ার তথ্য পাওয়ার পর দিল্লির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) শচীন শর্মার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সিজেপির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
সিজেপির সদস্য সৌরভ দাস জানান, প্রথমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং একজন কেন্দ্রীয় সচিবের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাবও নাকচ করা হয়। তাদের অবস্থান ছিল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের সঙ্গেই কেবল প্রতিনিধিদল বৈঠক করবে। পরে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জে পি নাড্ডা জানান, বেলা ১১টা ৫০ মিনিট থেকে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের পরিবেশ ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। প্রতিনিধিরা পরে লিখিত আবেদনও জমা দেন। তিনি আন্দোলনকারীদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
এদিকে সংসদের ভেতরেও এনডিএ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন। যদিও বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তা ঘিরে চলমান বিক্ষোভই আলোচনার মূল বিষয় ছিল। পরে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালও অল্প সময়ের জন্য অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠক করেন।
সরকারি এক কর্মকর্তা দ্য হিন্দুকে জানান, শুরুতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশনা ছিল। তবে তারা ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ ভবনের দিকে এগোতে শুরু করলে প্রথমে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ করা হয়। এতে কয়েকজন আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হন।
ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরাও আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তার মতে, চন্দ্রশেখর আজাদের আজাদ সমাজ পার্টি (কাশিরাম), আম আদমি পার্টি এবং সমাজবাদী পার্টির কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল। পাশাপাশি দিল্লির বাইরে থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে যোগ দেন, বিশেষ করে রাজস্থান থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অংশগ্রহণকারী এসেছিলেন।
উত্তর প্রদেশের আজমগড় থেকে আসা পুলিশে চাকরিপ্রত্যাশী নীতীশ বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারের জবাবদিহি করা উচিত। সংসদের এত কাছাকাছি কীভাবে পৌঁছাতে পেরেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম ব্যারিকেড ভেঙে যাওয়ার পর তারা হেঁটেই সামনে এগিয়ে যান এবং পথে কেউ তাদের থামায়নি।








