দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাকে তিনি ইসরায়েলি রাজনীতিতে নিজের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু এবার সেই রাজনৈতিক ‘ট্রাম্পকার্ড’ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। কারণ, একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের স্বার্থের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর প্রভাব আগের মতো কার্যকর আছে কি না, তা নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটানো নেতানিয়াহু মার্কিন রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে বেশ পরিচিত। আমেরিকান উচ্চারণে ইংরেজি বলার দক্ষতা এবং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন ধরে তাকে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে সুবিধা দিয়েছে।
তবে ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর সেই সম্পর্কের চিত্র কিছুটা বদলেছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের পর ট্রাম্প এখন যদি ইসরায়েলের মতামত উপেক্ষা করে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগিয়ে যান, তাহলে তা নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এমন এক সময়ে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন, যখন নিজ দেশেও তিনি নানা চাপের মুখে রয়েছেন। আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে তাকে জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার বিচার চলছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক সংকট এখনো সমাধান হয়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই নেতানিয়াহুর প্রথম ওয়াশিংটন সফর। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য হলো ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনো অটুটের বার্তা ইসরায়েলি ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
ইরান যুদ্ধ ঘিরে বদলেছে সমীকরণ
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে রাজি করাতে নেতানিয়াহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, অভিযান সফল হলে ইরানের সরকার দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ এবং সমঝোতার সম্ভাবনা ইসরায়েলের কিছু মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও নেতানিয়াহু সরকারের কিছু নীতির সমালোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর প্রতি তার সরকারের অবস্থান নিয়ে আপত্তি রয়েছে। এসব বসতি স্থাপনকারীর হাতে একজন মার্কিন সিনেটর বিচারবহির্ভূতভাবে আটক হওয়ার ঘটনায়ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়েও ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
সফরের পেছনে রাজনৈতিক হিসাব
ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নিউইয়র্কের সাবেক কনসাল জেনারেল অ্যালন পিঙ্কাসের মতে, নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের পেছনে বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, সফরের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে সদ্য প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার কথা বলা হলেও, বৈঠকে ইরান, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পিঙ্কাস মনে করেন, নেতানিয়াহুর দুটি লক্ষ্য থাকতে পারে। প্রথমত, ইসরায়েলের মিত্র ও সমালোচকদের দেখানো যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনো শক্তিশালী। দ্বিতীয়ত, নিজের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলায় ট্রাম্পের সমর্থন বা হস্তক্ষেপ পাওয়ার চেষ্টা করা।
২০২৫ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর পক্ষে ট্রাম্পের নজিরবিহীন রাজনৈতিক অবস্থানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে কমছে নেতানিয়াহুর গ্রহণযোগ্যতা?
নেতানিয়াহুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, যুক্তরাষ্ট্রে তার ভাবমূর্তি আগের মতো নেই। এমনকি দেশটির রক্ষণশীল শিবিরের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিও এখন তার সমালোচনা করছেন।
জনপ্রিয় পডকাস্ট উপস্থাপক টাকার কার্লসন এবং সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করেছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় ইসরায়েল সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বৈঠকে প্রকাশ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও ব্যক্তিগত আলোচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট আগের তুলনায় বেশি হিসাবি অবস্থান নিতে পারেন।
গত সোমবার সাংবাদিকেরা তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে নেতানিয়াহুর আপত্তি নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কী বিক্রি করবে, সে সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নির্ধারণ করতে পারে না।
‘নেতানিয়াহুর প্রভাবের সময় কি শেষ?’
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আহরন ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহু এমন সময়ে ওয়াশিংটনে গেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রে তার গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় কমেছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেকের ধারণা, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যা এড়ানো সম্ভব ছিল। ফলে এখন তাকে আগের মতো সবচেয়ে বিচক্ষণ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন।
ব্রেগম্যান বলেন, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর জন্য ট্রাম্পের সমর্থনকে আগের মতো নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তর করা সহজ হবে না।
ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী এবং একসময় নেতানিয়াহুর সহযোগী ছিলেন মিচেল বারাক। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অতীত সাফল্য থাকলেও তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
বারাক বলেন, নেতানিয়াহুর সমালোচনা এখন শুধু ডেমোক্র্যাট বা ইসরায়েলবিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; রিপাবলিকান দলের মধ্যেও তার সমালোচক তৈরি হয়েছে।
তার মতে, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি, ইরান যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য দেখাচ্ছে যে ট্রাম্প সবসময় প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর পাশে থাকবেন, তার নিশ্চয়তা আর নেই।
বারাকের ধারণা, ভবিষ্যতে ট্রাম্প হয়তো বলবেন, যুদ্ধের সময় নেতানিয়াহু নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু এখন ইসরায়েলে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন। এরপর তিনি অন্য কোনো ইসরায়েলি রাজনীতিকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন।
ফলে ওয়াশিংটন সফর নেতানিয়াহুর জন্য শুধু কূটনৈতিক বৈঠক নয়; এটি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ‘ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র’ হিসেবে তৈরি করা ভাবমূর্তি ধরে রাখার একটি বড় পরীক্ষা।








