ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার কতটা চাপে পড়েছে সেই প্রশ্ন এখন ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসন একদিকে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও দ্রুত উৎপাদনের আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা সতর্ক করছে যে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত থাকবে, সেই প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে পেনসিলভানিয়ায় অনুষ্ঠিত ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটে দেশের শীর্ষ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মান বিশ্বসেরা হলেও উৎপাদনের গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তার পাশে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নয়; একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পকে নতুন করে গতিশীল করাও। তবে এ আয়োজনের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এসেছে, ইরানে প্রায় ৪০ দিনের সামরিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার হয়েছে, যার প্রভাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুতেও পড়েছে।
মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিচালনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এর বড় অংশই গেছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারের পেছনে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ৮ এপ্রিল তেহরানের সঙ্গে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। একই সময়ে ইরানের ছোড়া ১ হাজার ৭০০টির বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ট্রাম্পের দাবি, বর্তমানে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতেই ইরানে হামলা স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হতে পারে, সেই আশঙ্কায় প্রেসিডেন্টকে সংঘাত না বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
যদিও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে অস্ত্রের ঘাটতির অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তার ভাষায়, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ বেশি এবং প্রয়োজনের তুলনায়ও মজুত পর্যাপ্ত।
তবে প্রশাসনের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। কিছুদিন আগেও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অস্ত্র সরবরাহে সংকটের কথা অস্বীকার করলেও সম্প্রতি মার্কিন সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটিকে তিনি জানিয়েছেন, পেন্টাগনের জরুরি সামরিক প্রয়োজন মেটাতে অতিরিক্ত ৮৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ প্রয়োজন।
সরকারি তথ্য গোপন থাকায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ঠিক কত অস্ত্র রয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) বলছে, বিশেষ করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমেছে এবং স্বল্প সময়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
সিএসআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ানের মতে, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। তার ভাষায়, একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতেই এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ফলে শুধু অর্থ বরাদ্দ দিলেই উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয়।
সেই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের পর যুক্তরাষ্ট্র কি ভবিষ্যতের বড় কোনো যুদ্ধে একই মাত্রার সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে? বিশেষ করে চীন, রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়ার মতো প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।








