সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

প্রবাসীদের লাগেজ চুরি ঠেকাতে শাহজালালে ২৪ ঘণ্টার নজরদারি, ৬ মাসে ১৬৬ জনের কারাদণ্ড

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি নিয়ে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের মধ্যেই নিরাপত্তা ও জবাবদিহি জোরদারে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরে কর্মরত চারজন এয়ারপোর্ট এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গত ছয় মাসে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধে ১৬৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ৩৪ জনকে মোট ৬১ লাখ ৫২ হাজার টাকা জরিমানা করে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর লাগেজ থেকে মালামাল চুরির অভিযোগগুলোর অনেকগুলো তদন্ত করে সিসিটিভি ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করা হয়েছে। এসব পর্যালোচনায় দেশের ভেতরে আসার পর বিমানবন্দরের কোনো কর্মীর লাগেজ থেকে মালামাল চুরির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ তদন্তে নজরদারিই প্রধান ভরসা
বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি আসা অভিযোগগুলোর একটি হলো লাগেজ থেকে মালামাল খোয়া যাওয়া। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি এবং কর্মীদের বডি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করা হচ্ছে।

এমন একটি ঘটনায় ভুলে ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন একজন। বিষয়টি ধরা পড়ার পর তাকে তাৎক্ষণিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বিমানবন্দরে গত সময়ে যাত্রীদের হারিয়ে যাওয়া ফোন, টাকা, অলংকারসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী খুঁজে পেয়ে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফেরত দিয়েছেন কর্মীরা। এমন ঘটনার সংখ্যা ২০০-এর বেশি বলে জানানো হয়েছে।

বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ইতিবাচক ঘটনা অনেক সময় আলোচনায় আসে না। ফলে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মানুষের ধারণায় শুধু চুরি বা অনিয়মের অভিযোগই বেশি জায়গা পায়।

লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে শতভাগ বডি ক্যামেরা
লাগেজের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে সব বিমানের লাগেজ ব্যবস্থাপনায় শতভাগ বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

একটি বিমানের লাগেজ ওঠানো-নামানোর সময় একসঙ্গে তিনজন কর্মী বডি ক্যামেরা ব্যবহার করেন। তাদের মধ্যে দুজন বিমানের ভেতরে থেকে লাগেজ নামান বা ওঠান। একজনের ক্যামেরায় তার নিজের পাশাপাশি সামনের কর্মীর কাজও দেখা যায়। নিচে থাকা তৃতীয় কর্মীর ক্যামেরায় বিমানের ভেতরে থাকা দুজনের কার্যক্রম ধারণ হয়।

কাজের পুরো সময় ক্যামেরাগুলো চালু রাখা বাধ্যতামূলক। কাজ শেষে ক্যামেরাগুলো কন্ট্রোল রুমে জমা দিতে হয়। নির্দিষ্ট স্থানে রাখার পর ধারণ করা ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্ভারে আপলোড হয় এবং ৯০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়।

প্রতিটি ফুটেজের দায়িত্বে থাকেন বাংলাদেশ বিমানে ডেপুটেশনে কর্মরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মেজর। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ফুটেজ যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।

শুধু কর্মী নয়, লাগেজের চলাচলও ক্যামেরার আওতায়
লাগেজ যেসব জায়গায় মানুষের সংস্পর্শে আসে, সেসব স্থানও সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ফলে বিমান থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে কে কখন লাগেজের সংস্পর্শে এসেছেন, কোনো অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করার সুযোগ থাকছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, এ ধরনের নজরদারির কারণে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর লাগেজ থেকে চুরি করা এখন আগের তুলনায় অত্যন্ত কঠিন।

বেল্ট থেকে অন্যের লাগেজ নেওয়ার চেষ্টা করেও একাধিক ব্যক্তি কারাদণ্ড পেয়েছেন। এসব পদক্ষেপের পর দেশে আসার পর লাগেজ বা লাগেজের ভেতরের মালামাল চুরির ঘটনা অনেকটাই কমেছে বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সব হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজের দায় কি বিমানবন্দরের?
লাগেজ নিয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব ধরনের ক্ষতি বা অনুপস্থিতির ঘটনা বিমানবন্দরে প্রবেশের পর ঘটে না।

অন্য দেশ থেকে বিমানে লাগেজ ওঠানোর আগে শেষ ধাপের নিরাপত্তা পরীক্ষায় নির্দিষ্ট ধরনের তালা না থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ লাগেজ খুলে পরীক্ষা করার অধিকার রাখে। বিশেষ করে টিপ তালা বা মাস্টার কী দিয়ে খোলা যায় এমন তালা কিংবা TSA-approved তালা না থাকলে নিরাপত্তার প্রয়োজনে তালা ভেঙেও লাগেজ পরীক্ষা করা হতে পারে।

কোনো নিষিদ্ধ বস্তু, ফ্লেমেবল বা নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সামগ্রী পাওয়া গেলে সেটি বাজেয়াপ্ত করে অনেক ক্ষেত্রে তালা ভাঙা অবস্থায় লাগেজ বিমানে পাঠানো হয়।

উত্তর আমেরিকার কিছু দেশ ছাড়া অধিকাংশ দেশে এমন তল্লাশির পর লাগেজের ভেতরে লিখিত নোটিশ না থাকার অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে যাত্রী দেশে পৌঁছে লাগেজের তালা ভাঙা বা কোনো জিনিস না পাওয়ার ঘটনা দেখলে সেটিকে বাংলাদেশে চুরি হয়েছে বলে মনে করতে পারেন।

এই বিভ্রান্তি কমাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিমানবন্দর থেকে তল্লাশির তথ্য লিখিতভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণ হলে ‘জিরো টলারেন্স’
বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি নিয়ে মানুষের আস্থার ঘাটতির সুযোগে ভুল তথ্য বা অপপ্রচারও ছড়ায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে কোনো যাত্রীর লাগেজ থেকে বাংলাদেশে আসার পর কিছু চুরি হয়েছে, এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সিসিটিভি, বডি-ওর্ন ক্যামেরার ফুটেজসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

বিমানবন্দরে যাত্রীদের সমস্যা কমানো এবং সার্বিক পরিবেশ উন্নত করতে ‘টিম এয়ারপোর্ট’ সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও জানানো হয়েছে।

যাত্রীদের কোনো অভিযোগ বা মতামত থাকলে বিমানবন্দর হটলাইন ১৩৬০০ নম্বরে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

ছয় মাসে ১৬৬ জনের কারাদণ্ড ও এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে জরিমানা করার পরিসংখ্যানের পাশাপাশি লাগেজ ব্যবস্থাপনায় ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর এই উদ্যোগের লক্ষ্য এখন একটাই, অভিযোগ উঠলে শুধু অস্বীকার নয়, ফুটেজের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা বের করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিমানবন্দরের প্রতি যাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *