বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

যুক্তরাজ্যে সমকামী সাজিয়ে বাংলাদেশিদের ভুয়া আশ্রয় আবেদন, গ্রেপ্তার ৩

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি পুরুষদের ভুয়া সমকামী পরিচয় ব্যবহার করে আশ্রয় আবেদন করানোর অভিযোগের তদন্তে নেমেছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০০টিরও বেশি আশ্রয় আবেদন নতুন করে যাচাই করছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্র দেশে ফিরে গেলে জীবননাশের আশঙ্কা থাকার মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজন বাংলাদেশির আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে। এজন্য ভুয়া নথি, সাজানো ছবি এবং সম্পর্কের প্রমাণ তৈরি করে আবেদনকারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়া হতো। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

অভিযানে গ্রেপ্তার ৩
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ভোরে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্টের কর্মকর্তারা কথিত চক্রটির বিরুদ্ধে অভিযান চালান।

অভিযানে দুজনকে প্রতারণা ও অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, গহনা এবং কয়েক হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছে। অন্য একজনকে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানের সন্দেহে আটক করা হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে বিবিসির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যে ভুয়া সমকামী পরিচয় ব্যবহার করে আশ্রয় পাওয়ার কৌশল নিয়ে অভিযোগ প্রকাশের পর এই অভিযান চালানো হলো।

কীভাবে তৈরি করা হতো ভুয়া প্রমাণ
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরাধ তদন্ত বিভাগের আঞ্চলিক প্রধান ক্রিস ফস্টারের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভুয়া চিঠি ও অন্যান্য নথি সরবরাহ করতেন। এসব সেবার জন্য আবেদনকারীদের কাছ থেকে ১ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়া হতো।

আশ্রয় আবেদনকারীদের সমকামী পরিচয়কে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে অবস্থিত ‘আপনজন’ নামের একটি বাংলাদেশি এলজিবিটি সংগঠন থেকে চিঠি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া আবেদনকারীরা সমকামী ধারণা তৈরি করতে সমকামী ব্যক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, যৌন সম্পর্ক কিংবা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সাজানো ছবি ও অন্যান্য প্রমাণও তৈরি করে দেওয়া হতো বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ।

‘আপনজন’কে ঘিরে কীভাবে সন্দেহ
ক্রিস ফস্টার জানান, আশ্রয় আবেদন পর্যালোচনার সময় কর্মকর্তারা কয়েকটি আবেদনে একই ধরনের প্যাটার্ন দেখতে পান। এসব আবেদনে ‘আপনজন’ সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসার পর সংগঠনটিকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয়।

এরপর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তের অংশ হিসেবে সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা আশ্রয় আবেদনগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এ ধরনের ১০০টিরও বেশি আবেদন বর্তমানে পুনর্মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে। তদন্তকারীদের আশঙ্কা, এসব আবেদনের কিছু হয়তো কোনো ধরনের সন্দেহ তৈরি না করেই এরই মধ্যে অনুমোদিত হয়ে থাকতে পারে।

আগেও প্রশ্ন উঠেছিল সংগঠনটির তথ্য-প্রমাণ নিয়ে
যুক্তরাজ্যের অভিবাসন বিচারকেরা এর আগে ‘আপনজন’ থেকে দেওয়া কিছু তথ্য ও নথির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এমনকি সংগঠনটির সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার দাবি করা এক আশ্রয়প্রার্থীর ছবিকে একজন বিচারক সাজানো বলে মনে করেছিলেন।

তবে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।

ভুয়া আবেদন প্রমাণ হলে কঠোর শাস্তির বিধান
যুক্তরাজ্যের প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, আশ্রয় আবেদনে জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

বিবিসির অনুসন্ধানে আগেই উঠেছিল অভিযোগ
এর আগে চলতি বছর বিবিসির এক অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যে ভুয়া সমকামী পরিচয় ব্যবহার করে আশ্রয় আবেদন তৈরির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। ওই অনুসন্ধানে কয়েকজন আইনজীবী ও পরামর্শদাতার বিরুদ্ধে অভিবাসীদের সমকামী হিসেবে উপস্থাপন করে আশ্রয় আবেদনে সহায়তার অভিযোগ ওঠে।

বিবিসির গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথনে তানিসা খান নামে এক পরামর্শদাতাকে সমকামী ক্লাবে তোলা ছবি ও অন্যান্য সহায়ক নথিসহ একটি ‘সম্পূর্ণ প্যাকেজ’ দেওয়ার কথা বলতে দেখা যায়।

তানিসা খান ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামের একটি কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকার কথা জানিয়েছিলেন। পরে সংগঠনটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে ভুয়া প্রমাণ তৈরিতে সহায়তার অভিযোগ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অস্বীকার করেন। তানিসা খানও ভুয়া আশ্রয় আবেদন কিংবা জাল প্রমাণ তৈরির পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *