বিদেশে কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির চাকরি, ভালো বেতনের আশায় সেই প্রস্তাবেই কম্বোডিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন মো. শফিকুল ইসলাম। যাওয়ার আগে শিখেছিলেন কম্পিউটারের প্রাথমিক কাজ, নিয়েছিলেন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং করেছিলেন সাড়ে চার লাখ টাকার চুক্তি। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি।
শফিকুলের দাবি, চাকরির পরিবর্তে তাকে নেওয়া হয় একটি ‘স্ক্যাম সেন্টারে’। সেখানে পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত হতে চাপ দেওয়া হয়। রাজি না হওয়ায় তাকে হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখা হয়। চলে মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত ৩ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার পরিশোধের পর তিনি মুক্তি পান বলে জানিয়েছেন।
৩০ বছর বয়সী শফিকুলের ভাষ্য, কম্বোডিয়ায় মোট ২২ দিনের মধ্যে ১৭ দিনই তাকে বন্দী অবস্থায় থাকতে হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে দেশে ফিরে এখন তিনি ওই ঘটনার বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।
চাকরির প্রস্তাব ফেসবুকের পরিচয় থেকে
রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন শফিকুল। প্রায় আট বছর ধরে অগ্নিনির্বাপণসামগ্রীর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
ফেসবুকে মো. মাসুদ মিয়া নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়ের পর বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পান শফিকুল। তাকে বলা হয়, কম্বোডিয়ায় কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির কাজ করতে হবে। প্রস্তাবে রাজি হয়ে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে মাসুদের সঙ্গে সাড়ে চার লাখ টাকার চুক্তি করেন তিনি।
বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে কম্পিউটারের প্রাথমিক কাজ শেখার পাশাপাশি ঢাকার প্রবাসীকল্যাণ ভবনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেন। পরে ছাড়পত্র বা স্মার্টকার্ডও পান।
প্রথমে ১৬ অক্টোবর ফ্লাইট নির্ধারিত থাকলেও পরে তারিখ পরিবর্তন করে ২৬ অক্টোবর করা হয়।
শফিকুলের পাসপোর্ট, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি এবং আর্থিক লেনদেনের কিছু তথ্য এই প্রতিবেদক দেখেছেন। তবে কম্বোডিয়ায় তাকে আটকে রাখা, নির্যাতন এবং বিক্রির চেষ্টার বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিমানবন্দরেই প্রথম জটিলতা
ঢাকার বিমানবন্দরে যাওয়ার পর ইমিগ্রেশন পুলিশ শফিকুলকে আটকে দেয়। তাকে প্রবাসী ডেস্ক থেকে স্মার্টকার্ড যাচাই করে আসতে বলা হয়।
শফিকুলের ভাষ্য, প্রবাসী ডেস্কের এক কর্মী তার পাসপোর্ট দেখে নাম যাচাই না করেই তাকে ছেড়ে দেন। পরে আবার ইমিগ্রেশনে গেলে পুলিশ তাকে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
তবে কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর নতুন জটিলতায় পড়েন তিনি। তার দাবি, দেশটির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকে পাসপোর্ট জব্দ করে। তখন নমপেন বিমানবন্দর থেকে কম্বোডিয়ায় থাকা মাসুদের সহযোগী মোস্তফা মুকুলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন তিনি।
কিছুক্ষণ পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য তার ফোনের বার্তা দেখেন। শফিকুলের দাবি, এরপর তার এমপ্লয়মেন্ট ভিসা পরিবর্তন করে ভ্রমণ ভিসা দেওয়া হয়। পরে বিমানবন্দর থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়।
বিমানবন্দর থেকে যে পথে ‘স্ক্যাম সেন্টারে’
বিমানবন্দরের বাইরে শফিকুলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মুকুলের সহযোগী আরিফ। তার সঙ্গে অটোরিকশায় করে প্রায় ৪০ মিনিট পর একটি আবাসিক ভবনে পৌঁছান শফিকুল। এর মধ্যেই আরিফ তার কাছ থেকে ৮০০ মার্কিন ডলার নেন বলে দাবি তার।
রাত হয়ে যাওয়ায় সেখানে কিছু খাবার দেওয়া হয়। বলা হয়, কিছুক্ষণ পর তার চাকরির সাক্ষাৎকার হবে। কিন্তু রাত প্রায় একটার দিকে তাকে আরও একজনের সঙ্গে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।
পরদিন ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি কমপ্লেক্সে পৌঁছান তারা। শফিকুলের বর্ণনা অনুযায়ী, সীমানাপ্রাচীরঘেরা ওই চত্বরে ছয়তলা তিনটি ভবন ছিল। তাদের রাখা হয় একটি ভবনের তৃতীয় তলায়, আর কাজের জায়গা ছিল পঞ্চম তলায়।
সেখানে পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও মুঠোফোন নিয়ে নেওয়া হয়। চীনা ভাষায় লেখা একটি কাগজে স্বাক্ষর করানো হয় বলেও দাবি করেন তিনি। পরে হিন্দি ও ইংরেজিতে দুটি স্ক্রিপ্ট দেওয়া হয় এবং সেগুলো মুখস্থ করতে বলা হয়।
২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয় কাজ।
পুলিশ ও ব্যাংক সেজে প্রতারণার অভিযোগ
শফিকুলের দাবি, ওই স্থাপনাটি ছিল মূলত একটি ‘স্ক্যাম সেন্টার’, যেখানে ‘কলিং’ ও ‘চ্যাটিং’, দুই ধরনের কাজ চলত।
তার বর্ণনা অনুযায়ী, কলিং বিভাগের কাজ কয়েকটি ধাপে ভাগ করা ছিল। প্রথম ধাপে তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন নম্বরে ফোন করে নাম ও ঠিকানা যাচাই করা হতো। মূলত ভারতীয় নাগরিকদের টার্গেট করা হতো বলে দাবি তার।
এরপর দ্বিতীয় ধাপে আধার কার্ডের তথ্য যাচাইয়ের নামে ফোন করা হতো। তৃতীয় ধাপে পুলিশ পরিচয়ে ভিডিও কল করে ভয় দেখানো হতো। এ জন্য একটি কক্ষকে থানার আদলে সাজানো ছিল বলে জানান শফিকুল। সেখানে হাতকড়া পরানো ব্যক্তিকেও দেখানো হতো।
সবশেষে ব্যাংকের আদলে সাজানো কক্ষ থেকে একই ব্যক্তিকে ফোন করে জরিমানার কথা বলা এবং বিভিন্ন ব্যাংক-সংক্রান্ত তথ্য নেওয়া হতো বলে দাবি তার। পরে এসব তথ্য ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো বলে জানান তিনি।
চ্যাটিং বিভাগের কাজও ভিন্ন ছিল বলে দাবি শফিকুলের। তার ভাষ্য, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ডেটিং অ্যাপে নারীদের নামে ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। দীর্ঘ সময় চ্যাটের পর অডিও কলে কথা বলার পর্যায়েও যেত তারা। সফটওয়্যারের মাধ্যমে পুরুষের কণ্ঠ নারীর কণ্ঠে পরিবর্তন করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করা হতো বলেও দাবি করেন তিনি। পরে বিভিন্ন কৌশলে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো।
কাজ করতে অস্বীকৃতি, এরপর নির্যাতনের অভিযোগ
শফিকুল জানান, ২৮ অক্টোবর তিনি ও ইশতিয়াক রাব্বী নামের আরেকজন কলিং বিভাগের দ্বিতীয় ধাপের কাজে যোগ দেন। তার দাবি, সেখানে অধিকাংশ কর্মী ছিলেন পাকিস্তানি, পাশাপাশি কিছু বাংলাদেশি ও ভারতীয়ও ছিলেন।
দুই দিন পর তিনি ও রাব্বী ওই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখা হয় বলে দাবি শফিকুলের।
শফিকুলের ভাষ্য, সেদিন রাতেই তাদের ‘ইন্টারভিউ’ নেওয়া হয়। এরপর রাব্বীকে অন্য জায়গায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। আর তাকে সেখানে আটকে রেখে মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তার।
তিনি জানান, তাকে বিক্রি করারও একাধিকবার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।
৩ হাজার ২০০ ডলার দিয়ে মুক্তি
শফিকুলের দাবি, ১৬ নভেম্বর হঠাৎ তাকে ছেড়ে দিয়ে একটি গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। গাড়িটি সিয়েম রিয়েপের একটি নির্জন এলাকায় গিয়ে তাকে নামিয়ে দেয়। সেখানে তার পাসপোর্ট ও মুঠোফোন ফেরত দেওয়া হয়।
গাড়িচালককে অনুরোধ করলে তিনি শফিকুলকে একটি বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান এবং নমপেনের টিকিট করে দেন।
এরপর দেশে ফোন করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন শফিকুল। তখন জানতে পারেন, তার ছোট ভাই কম্বোডিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে সহায়তা চেয়েছেন। শফিকুলের ভাষ্য অনুযায়ী, কমিউনিটির সদস্যরা ৩ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার পরিশোধ করে তাকে ওই স্ক্যাম সেন্টার থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
নমপেনে পৌঁছানোর পর কমিউনিটির এক প্রতিনিধির বাসায় ওঠেন তিনি। সেখানে দুই দিন থাকার পর দেশে থেকে পাঠানো টিকিটে ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশে ফেরেন। দেশে ফেরার সময় তার সঙ্গে কোনো অর্থ ছিল না বলে জানান তিনি।
দালালের খোঁজ নেই, চান বিচার
দেশে ফিরে শফিকুল যোগাযোগ করেন মাসুদের সঙ্গে। তার দাবি, মাসুদ তাকে বিক্রি করে দেওয়ার বিষয়টি জানতেন না বলে দাবি করেন এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে এরপর থেকে মাসুদের আর কোনো খোঁজ পাননি শফিকুল। তার অফিসও বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শফিকুল। তার অভিযোগ, বিদেশে চাকরির আশায় গিয়ে তাকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। নির্যাতন সহ্য করেও কোনো ক্ষতিপূরণ বা বিচার পাননি তিনি।
এখন সরকারের সহায়তায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং তার ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন শফিকুল।








