শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

প্রবাসীদের নিরাপত্তায় বিমানবন্দর সড়কে বসছে শতাধিক সিসি ক্যামেরা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর প্রবাসীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর সড়কজুড়ে বাড়ানো হচ্ছে নজরদারি। কাওলা থেকে উত্তরা জসিম উদ্দিন মোড় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে সিসিটিভির আওতায় আনতে প্রায় ১০০টি নতুন ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বিমানবন্দর থানা পুলিশ।

প্রবাসীদের লক্ষ্য করে ছিনতাই, চালকবেশী ডাকাতি ও অজ্ঞান পার্টির তৎপরতার অভিযোগের মধ্যে পুলিশের এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে বিমানবন্দর এলাকার কিছু অংশে ২৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা চালু রয়েছে।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম তালুকদার জানান, পুরো এলাকাকে সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনার কাজ শুরু হয়েছে। প্রায় ১০০টি ক্যামেরা স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে ২৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা চালু আছে। থার্ড টার্মিনালের সামনের এলাকা থেকে গোলচত্বর মোড় পর্যন্ত এসব ক্যামেরা কার্যকর রয়েছে। নতুন পর্যায়ে ক্রাউন প্লাজা থেকে জসিম উদ্দিন মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ, বিমানবন্দর স্টেশনের সামনের অংশ, রেললাইন পার হয়ে হজ ক্যাম্প পর্যন্ত এলাকাকে ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে। দ্রুতই স্থাপনের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।

পুলিশ বলছে, বিমানবন্দর এলাকায় প্রবাসীদের টার্গেট করে অপরাধের চেষ্টা ঠেকাতে ক্যামেরাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

প্রবাসীদের ঘিরে সক্রিয় একাধিক চক্র
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর প্রবাসীদের টার্গেট করে একাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি চালকবেশী ডাকাত ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

সর্বশেষ কাওলা এলাকায় এক প্রবাসীর বোনের বিয়েতে পাঠানো স্বর্ণ লুটের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেই ওই ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

রাতে বাড়ে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর সামনের মোড়, হাতের বাঁ দিকে কিশোরগঞ্জ ও ভৈরবের বাস কাউন্টারের সামনের অংশ এবং পুলিশ বক্সের কিছুটা দক্ষিণে কাওলা মোড় এলাকায় ছিনতাইকারীদের তৎপরতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বিমানবন্দরের সামনের এক ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, দিন-রাত এই এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। প্রবাসীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এ ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছেন।

তার ভাষ্য, দিনের বেলায় ভবঘুরে ও টোকাইদের মধ্যে ছিনতাইকারীদের দেখা গেলেও রাতে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়। তাদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো বিদেশফেরত বা বিদেশগামী প্রবাসীরা।

আরেক ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম বলেন, বিমানবন্দরের সামনে সবসময় মানুষের ভিড় থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যক্তি প্রবাসীদের অনুসরণ করে এবং তাদের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের কারও কাছে অস্ত্রও থাকে বলে দাবি করেন তিনি।

বিশেষ করে রাতের বেলায় বিমানবন্দর এলাকার দুই-তিনটি স্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন স্থানীয়রা।

কম ভাড়ার প্রস্তাবই কখনো হয়ে ওঠে ফাঁদ
বিমানবন্দর এলাকায় প্রবাসীদের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে চালকবেশী ডাকাত চক্রের বিষয়টি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর যেসব প্রবাসীর জন্য গাড়ি বা স্বজন অপেক্ষা করেন না, তাদের টার্গেট করে কিছু চালক।

স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় কম টাকায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রবাসী রাজি হলে পথে চক্রের অন্য সদস্যদের গাড়িতে তোলা হয়। পরে নির্জন কোনো জায়গায় নিয়ে মারধর করে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনায় শুধু বিমানবন্দর থেকে সরাসরি যাওয়া প্রবাসীরাই নন, তাদের স্বজনরাও কখনো কখনো ভুক্তভোগী হন।

অনেক প্রবাসী ফ্লাইটের দুই-তিন দিন আগে ঢাকায় এসে আশপাশের হোটেলে অবস্থান করেন। ফ্লাইটের সময় হলে স্বজনদের কেউ কেউ রাতে কম ভাড়ার গাড়িতে বিমানবন্দরে যাওয়ার সময়ও এমন চক্রের ফাঁদে পড়েন বলে স্থানীয়রা জানান।

প্রবাসীর বেশেই অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা
বিমানবন্দর এলাকায় অজ্ঞান পার্টির তৎপরতার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এ চক্রের সদস্যরা অনেক সময় এমন পোশাক ও বেশভূষা ধারণ করে, যাতে তাদের বিদেশফেরত বা বিদেশগামী মনে হয়।

বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া প্রবাসীদের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তির মতো আচরণ করে তারা প্রথমে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে। পরে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, চক্রের সদস্যদের পোশাক ও আচরণ অনেক সময় এমন থাকে যে প্রথম দেখায় তাদের সন্দেহ করার সুযোগ থাকে না।

সাদা পোশাকেও নজরদারি
বিমানবন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, প্রবাসীদের নিরাপত্তায় সিসিটিভির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

ওসি কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, বিমানবন্দর এলাকায় প্রবাসীদের লক্ষ্য করে অপরাধ ঠেকাতেই নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

তিনি জানান, প্রবাসীদের চলাচলের সময় তাদের বিরক্ত করে এমন ভিক্ষুক ও টোকাইদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি এ ধরনের কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে এপিবিএনের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে, যাতে প্রবাসীদের লক্ষ্য করে কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতে না পারে।

পুলিশের আশা, নতুন সিসিটিভি নেটওয়ার্ক চালু হলে বিমানবন্দর থেকে কাওলা হয়ে উত্তরার জসিম উদ্দিন মোড় পর্যন্ত এলাকায় অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারির আওতায় আসবে। একই সঙ্গে কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত ফুটেজ সংগ্রহ করে অপরাধী শনাক্ত করাও সহজ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *