মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সবশেষ

কলম ধরেননি কখনও, তবু ১০ বছরের সাধনায় কোরআনের হাফেজা ৮২ বছরের মরিয়ম

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজায় কখনও পা রাখা হয়নি। পড়তে বা লিখতেও জানেন না। কিন্তু বয়স যখন আশির ঘর পেরিয়েছে, তখন তিনি হয়ে উঠেছেন পবিত্র কোরআনের একজন হাফেজা। শুধু শুনে শুনেই সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করে ইয়েমেনে অনুপ্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন ৮২ বছর বয়সী হাজিয়া মরিয়ম আর-রামিমাহ।

ইয়েমেনের তায়েজ প্রদেশের সাবির পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত হাদনান গ্রামের বাসিন্দা মরিয়মের জীবন ছিল একেবারেই সাধারণ। এমন এক সময়ে তার বেড়ে ওঠা, যখন গ্রামীণ মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সংসার সামলানো, কৃষিকাজ করা এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করেই কেটে গেছে জীবনের বড় একটি অংশ।

তবে ব্যস্ত জীবনের আড়ালেও একটি স্বপ্ন তিনি লালন করতেন, একদিন পুরো কোরআন মুখস্থ করবেন। আশপাশের অনেকের কাছে বিষয়টি ছিল কল্পনার মতো, কারণ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরক্ষর।

অবশেষে ২০০৬ সালে, বয়স ষাট পেরোনোর পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে যাত্রা শুরু করেন মরিয়ম। তার ছেলে শায়খ মুখতার আর-রামিমাহ এলাকায় একটি কোরআন হিফজ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলে নতুন করে অনুপ্রাণিত হন তিনি। এরপর একজন নারী শিক্ষিকার সহায়তায় শুরু হয় তার দীর্ঘ হিফজের পথচলা।

পড়তে না জানলেও তার ছিল অসাধারণ মনোযোগ এবং শক্তিশালী শ্রবণক্ষমতা। প্রতিদিন আসরের নামাজের পর তিনি হিফজের ক্লাসে অংশ নিতেন। সেখানে আগের দিনের মুখস্থ অংশ শুনিয়ে নতুন আয়াত শিখতেন।

হিফজের সবচেয়ে বড় সহচর ছিল একটি ক্যাসেট রেকর্ডার। মাগরিব ও ইশার মাঝের সময়টুকুতে তিনি বিখ্যাত কারি শায়খ ফারেস আব্বাদের তেলাওয়াত বারবার শুনতেন। ফজরের আগেও ঘুম থেকে উঠে আবার শুনতেন সেই আয়াতগুলো। একটি ক্যাসেট সম্পূর্ণ মুখস্থ হয়ে গেলে তার সন্তানরা নতুন ক্যাসেট এনে দিতেন।

এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। কোরআনের মিলযুক্ত আয়াতগুলো মনে রাখা ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সূরা তওবা ও সূরা রা’দ মুখস্থ করতে গিয়ে তাকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। কিন্তু নিরলস পুনরাবৃত্তি এবং ধৈর্যের মাধ্যমে তিনি প্রতিটি বাধা অতিক্রম করেন।

সব সূরার মধ্যে সূরা বাকারা ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়। এই সূরার বর্ণনা ও ঘটনাপ্রবাহ তাকে মানসিক প্রশান্তি দিত বলে পরিবারকে জানিয়েছেন তিনি।

প্রায় এক দশকের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার পর ২০১৬ সালে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্ত। শেষ আয়াতটি মুখস্থ শোনানোর মাধ্যমে সম্পূর্ণ কোরআনের হাফেজা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেন মরিয়ম। দীর্ঘ সাধনার সফল পরিণতিতে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি আল্লাহর শুকরিয়ায় সিজদায় লুটিয়ে পড়েন।

তার এই অর্জন শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজকে বিস্মিত করেছে। মরিয়মের ২১ সন্তান ও নাতি-নাতনির অনেকেই উচ্চশিক্ষিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কিন্তু তাদের কাছেও সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল, যে নারী কোনোদিন বই পড়েননি, তিনি শুধুমাত্র শ্রবণের মাধ্যমে পুরো কোরআন মুখস্থ করেছেন। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, আঞ্চলিক তায়েজি উচ্চারণ বজায় রেখেও তিনি শুদ্ধ তাজভিদ ও মাখরাজ অনুসরণ করে কোরআন তেলাওয়াত করতে সক্ষম হয়েছেন।

মরিয়মের হিফজের দীর্ঘ সময় কেটেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে। তায়েজ অঞ্চলে সংঘাত, অবরোধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা তার সংকল্পকে দুর্বল করতে পারেনি। বিদ্যুৎহীন রাতগুলোতেও কোরআনের আয়াত ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

বর্তমানে বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তিনি। উচ্চ রক্তচাপের কারণে একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি অনেকটাই কমে গেছে। বয়সের ভারে কিছু আয়াত ভুলেও যান। তবুও তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কোরআন। শয্যাশায়ী অবস্থাতেও তার ঠোঁটে জারি থাকে আল্লাহর জিকির।

হাজিয়া মরিয়ম আর-রামিমাহর গল্প আজ শুধু একজন হাফেজার গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকলে বয়স, শিক্ষা কিংবা প্রতিকূলতা কোনো স্বপ্নের পথ রুদ্ধ করতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *