বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

সবশেষ

চার দশকের চাপ-প্রতিবন্ধকতার পর সমঝোতা, মধ্যপ্রাচ্যে কি ইরান বাস্তবতা মেনে নিলো যুক্তরাষ্ট্র?

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কি বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা অন্তত এমন প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। কারণ, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও সামরিক হুমকির মাধ্যমে তেহরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যে কৌশল অনুসরণ করে এসেছে ওয়াশিংটন, বর্তমান সমঝোতা সেই নীতির কার্যকারিতা নিয়েই নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক বৈরিতায় পূর্ণ। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ধারাবাহিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার চেষ্টা চালিয়েছে এবং বিভিন্ন সময় সামরিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে দেশটির ওপর চাপ বজায় রেখেছে।

ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করা এবং দেশটিকে পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসা। কিন্তু কয়েক দশক পরও ইরান তার রাজনৈতিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেছে এবং বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পেরেছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সমঝোতা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। কারণ, আলোচনায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী চুক্তির আওতায় নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ এবং কিছু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহারের মতো বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের মতো দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ইস্যুগুলো আপাতত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন মহল দাবি করে আসছিল, ইরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার পূর্বশর্ত হওয়া উচিত দেশটির সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনা। কিন্তু বর্তমান আলোচনায় এসব শর্তের অনুপস্থিতি অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

লেবানন ইস্যুতেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনার সময় লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং অবরোধসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কিছু ধরনের নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে সম্ভাব্য সমঝোতা সামনে আসতেই ইসরায়েলের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, লেবানন-সংক্রান্ত কোনো সমঝোতার বাধ্যবাধকতা ইসরায়েল স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেনে নেবে না।

এ অবস্থান অনেক বিশ্লেষকের মতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্য নীতির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্যের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। অতীতে দুই দেশের অবস্থান প্রায় অভিন্ন থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু বিষয়ে মতভেদের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও সমঝোতার সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু নতুন আলোচনায় আঞ্চলিক দেশগুলোর অংশগ্রহণে নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ধারণা সামনে আসায় উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ভূমিকাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের ইঙ্গিত মিলছে।

তবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমন ধারণা দেওয়ার সুযোগ নেই। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতবিরোধ বিদ্যমান। দুই দেশের দীর্ঘ সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কের ইতিহাসও দেখায়, কোনো সমঝোতা চূড়ান্ত হলেও তা টেকসই হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তারপরও চলমান আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, এটি শুধু একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক বা অর্থনৈতিক চুক্তির বিষয় নয়; বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন চুক্তির নির্দিষ্ট ধারাগুলো নয়। বরং প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি অবশেষে স্বীকার করতে শুরু করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের মতো একমুখী নয় এবং এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এখন একাধিক শক্তির প্রভাব সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে?

সমঝোতা চূড়ান্ত হলে সেই প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট হতে পারে। তবে আপাতত এটুকু বলা যায়, কয়েক দশকের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে নতুন সংলাপের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *