ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক পরিবার আছে, যাদের কাছে এবার ঈদ এসেছে গভীর শোক আর অপূর্ণতার স্মৃতি নিয়ে। জীবিকার সন্ধানে কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিদেশে যাওয়া প্রিয় মানুষগুলো আর কখনও ফিরবে না, সেই বাস্তবতা মেনে নিতে হচ্ছে তাদের।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার বজলুর রশীদ ও মনোহার আলীর পরিবার এখন এমনই এক দুঃসহ সময় পার করছে। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় তারা ইরাকের কুর্দিস্তানে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু গত ২৫ মে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় দুজনেরই মৃত্যু হয়। সেই খবর পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঋণ নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন তারা। দেশে ফিরে কিছু একটা করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনা সবকিছু থামিয়ে দিয়েছে। এখন তাদের একমাত্র প্রত্যাশা, মরদেহ দ্রুত দেশে এনে শেষ বিদায়ের ব্যবস্থা করা হোক।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মুরাদ শেখের পরিবারও ঈদের আগমনে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে না। সৌদি আরবের দাম্মামে কর্মরত অবস্থায় গত ২৩ এপ্রিল রাস্তা পার হওয়ার সময় বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান তিনি। পরে ৯ মে তার মরদেহ দেশে আনা হয় এবং নিজ এলাকায় দাফন সম্পন্ন হয়।
স্বজনরা জানান, ঈদের পর দেশে ফেরার কথা ছিল মুরাদের। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর নানা পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ হয়েছে একটি মরদেহ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। তার অনুপস্থিতি এখন প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করছেন পরিবারের সদস্যরা।
কুমিল্লার বুড়িচংয়ের খোরশেদ আলমও পরিবারের স্বপ্ন পূরণে বিদেশে কর্মরত ছিলেন। ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন মাস আগে মালয়েশিয়ায় ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গত ১৭ মে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ২২ মে তার মরদেহ দেশে পৌঁছায়।
খোরশেদের বাবা বলেন, সন্তানের মৃত্যুর মতো কষ্ট আর কিছু হতে পারে না। এখন জীবনের সব আনন্দই অর্থহীন মনে হয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে খোরশেদের কিছু পাওনা রয়েছে। সেই অর্থ আদায়ে সহযোগিতা প্রয়োজন। তিন সন্তান নিয়ে তার পরিবার বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। সরকারি সহায়তা পেলে পরিবারটি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়া জয়পুরহাটের শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমানের মৃত্যুও নাড়া দিয়েছে অনেককে। ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো এই তরুণ গত ৩ মে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। ২২ মে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।
ছেলের স্মৃতিতে এখনও ভেঙে পড়েন তার বাবা-মা। ঘরের প্রতিটি জিনিস, প্রতিটি স্মৃতি যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয় হাসিবুর আর নেই। মা বলেন, ছেলের পছন্দের খাবারের কথা মনে পড়লেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে। বাবা জানান, বিদেশে থাকলেও প্রতিদিন ছেলের খোঁজ নিতেন। এখন সেই ফোনালাপগুলোই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।
দেশের বাইরে থাকা লাখো প্রবাসীর সাফল্যের গল্পের আড়ালে এমন অসংখ্য পরিবারের কান্না চাপা পড়ে থাকে। যারা প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, তাদের কাছে এবার ঈদ আনন্দের নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মৃতি আর না ফেরার বেদনা নিয়ে কাটছে প্রতিটি দিন।








